স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা :: মানুষ কেন বিষণ্নতায় ভোগেন, এর প্রভাব কেন ভয়ানক
বর্তমান সময় আশপাশে তাকালে তরুণ প্রজন্মের অনেককে হতাশা কিংবা বিষণ্নতায় ভুগতে দেখা যায়। নানা কারণেই মানুষ হতাশায় ভোগেন। তবে স্কুল-কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থী এবং বয়স্ক ব্যক্তিদের তুলনায় যুবক-যুবতীদের মধ্যে হতাশায় বেশি ভোগতে দেখা যায়। কেউ কেউ স্বাভাবিক হতে না পেরে আত্মহত্যার মতো চরম সিদ্ধান্ত নিয়েও থাকেন।
মানসিক স্বাস্থ্য ও মানব আচরণ বিষয়ক মার্কিন সংস্থা ও ম্যাগাজিন সাইকোলজিক্যাল টুডের প্রতিবেদনে বিষণ্নতা বা ডিপ্রেশন ও আত্মহত্যার ব্যাপারে বলা হয়েছে―নতুন সহস্রাব্দের শুরু থেকে বিশ্বজুড়ে আত্মহত্যার হার কমলেও যুক্তরাষ্ট্রে এটি বাড়ছে। বর্তমানে দেশটিতে প্রতি এক লাখ মানুষের মধ্যে ১৪.১২ জন আত্মহত্যা করছেন; যা ২০২২ সালের সর্বোচ্চ ১৪.২ জনের তুলনায় কিছুটা কম। ১৯৯৯ সালের পর থেকে দেশটিতে আত্মহত্যার হার ৩৫ শতাংশ বেড়েছে। ২০০৬ সাল থেকে আত্মহত্যাজনিত মৃত্যু বাড়ার গতিও ত্বরান্বিত হয়েছে।ইউএস ন্যাশনাল সেন্টার ফর হেলথ স্ট্যাটিস্টিকসের তথ্য অনুযায়ী, নারীদের ক্ষেত্রে ৪৫ থেকে ৬৪ বছর বয়সীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বেশি দেখা গেছে। আর পুরুষদের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ বয়সসীমা ৭৫ বছর বা এরও বেশি। নারী-পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রে শহর অঞ্চলের তুলনায় গ্রামীণ অঞ্চলে আত্মহত্যার হার ব্যাপকভাবে বেশি।অধিকাংশ আত্মহত্যার বিষয় কোনো না কোনো মানসিক রোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। বিশেষ করে বিষণ্নতা বা ডিপ্রেশন। বিষণ্নতা যত তীব্র হয়, আত্মহত্যার ঝুঁকিও তত বাড়ে। এরপরও বেশি বিষণ্নতায় ভোগা মানুষ নিজেকে নিজে শেষ করেন না। গবেষণায় দেখা গেছে, বিষণ্নতায় থাকা ব্যক্তিদের প্রায় ৫ শতাংশের মনে আত্মহত্যার ভাবনা বা ‘সুইসাইডাল আইডিয়াশন’ আসতে পারে। এদের মধ্যে অল্প সংখ্যক মানুষ জীবন শেষ করার জন্য পরিকল্পনা করেন।
বিষণ্নতা কীভাবে আত্মহত্যার দিকে ধাবিত করে:
অনেকেরই জীবনের কঠিন কোনো সময় বা কোনো না কোনো সময় স্বল্প সময়ের জন্য হলেও আত্মহত্যার ভাবনা আসে। সাধারণত তারা নিজেদের বা প্রিয়জনদের হারানোর কথা ভেবে সেই ভাবনা প্রতিরোধ করেন। কিন্তু বিষণ্নতা তার নিজস্ব বৈশিষ্ট্যের কারণে মানুষের এসব ভাবনার নমনীয়তা বা অনুভববোধ নষ্ট করে। যা চিন্তা ও অনুভূতির এমন ধরন তৈরি করে, যে কারণে আক্রান্ত ব্যক্তিরা তাদের বর্তমান মানসিক পরিস্থিতি থেকে বের হওয়ার উপায় খুঁজে পান না বা ভবিষ্যতে ভালো বিষণ্নতা শুধু মানুষকে নেতিবাচকতায় নিমজ্জিত করে না। একই সঙ্গে তাদের বর্তমান পরিস্থিতি ছাড়াও অতীতের সব ব্যর্থতা, প্রিয়জন হারানোর যন্ত্রণা, সম্পর্কের বিচ্ছেদ এবং শৈশবের প্রতিকূল অভিজ্ঞতাও তখন ভাবতে বাধ্য করে। এসব নেতিবাচকতা মনকে অধিকতর বিষাদগ্রস্ত করে। পাশাপাশি বিষণ্নতা কষ্টের অনুভূতিকে আরও বাড়িয়ে দেয়। এ কারণে বিষণ্নতায় ভোগা ব্যক্তিরা মানসিক যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাওয়ার একমাত্র উপায় হিসেবে আত্মহত্যার পথ দেখতে পান।

মানসিক স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সমস্যা চিকিৎসায় নিরাময়যোগ্য। ছবি: এআই দিয়ে তৈরি
বিষণ্নতায় আক্রান্তদের মধ্যে আত্মহত্যার হার কত:
ইউএস ডিপার্টমেন্ট অব হেলথ অ্যান্ড হিউম্যান সার্ভিসেসের মতে, বহির্বিভাগে বিষণ্নতার চিকিৎসা নেয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ২ শতাংশ মানুষ নিজেকে শেষ করেন। আর বিষণ্নতার চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের মধ্যে আত্মহত্যার হার দ্বিগুণ, অর্থাৎ ৪ শতাংশ। আত্মহত্যার চিন্তা বা চেষ্টার কারণে যারা বিষণ্নতার চিকিৎসা নিতে হাসপাতালে ভর্তি, তাদের মধ্যে ৬ শতাংশ শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যা করেন। আর যারা আত্মহত্যা করেন, তাদের প্রায় ৬০ শতাংশের কোনো না কোনো প্রচণ্ড হতাশায় থাকা মানুষরা তাদের কথা বলার ধরনের মাধ্যমে আত্মহত্যার ইঙ্গিত দিয়ে থাকেন। তাদের জীবনের কোনো উদ্দেশ্য না থাকা, নিজেকে বন্দি বা আটকে পড়া বোধ করা, অন্যদের ওপর বোঝা হয়ে থাকা বা অসহনীয় যন্ত্রণা অনুভব করার কথা বলেন। কিছু আচরণও ঝুঁকি নির্দেশ করে, যেমন- নিজেদের বিচ্ছিন্ন করা, অনলাইনে জীবন শেষ করার উপায় খোঁজা, বিদায় জানানোর জন্য মানুষকে ফোন করা বা দেখা করা এবং নিজের পছন্দের জিনিস অন্যকে দিয়ে দেয়া। আবার কখনো কখনো হঠাৎ মেজাজ ভালো হওয়াও আত্মহত্যার ইঙ্গিত দিতে পারে