হারিয়ে যাচ্ছে বরিশালের ঐতিহ্যবাহী কাচারি ঘর!

রিপোর্টার নাম
  • আপডেট টাইমঃ Sunday, November 1, 2026,
  • 2 সংবাদটি পঠিক হয়েছে

একসময় গ্রামীণ জনপদের অবস্থাসম্পন্ন গৃহস্থের বাড়িতে কাচারি ঘর ছিল অবিচ্ছেদ্য অংশ। অতিথি আপ্যায়ন, পথচারীদের বিশ্রাম, সামাজিক বিচার-সালিশ, গল্প-আড্ডা থেকে শুরু করে শিক্ষা কার্যক্রম—বহুমুখী কাজে ব্যবহৃত হতো এসব ঘর। গ্রামবাংলার ইতিহাস, ঐতিহ্য, কৃষ্টি ও সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে পরিচিত সেই কাচারি ঘর এখন কালের বিবর্তনে হারিয়ে যেতে বসেছে। আধুনিক বাড়ির গেস্টরুম কিংবা ড্রয়িংরুমের আদি সংস্করণ বলা যায় এসব কাচারি ঘরকে।

 

প্রবীণদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মূল বসতঘর থেকে কিছুটা দূরে খোলামেলা পরিবেশে আলাদা করে নির্মাণ করা হতো কাচারি ঘর। বাড়িতে আসা অতিথি, পথচারী কিংবা সাক্ষাৎপ্রার্থীরা সেখানে বসতেন। প্রয়োজনে এক-দুই রাত থাকার ব্যবস্থাও থাকত। কাঠের কারুকাজ করা দরজা-জানালা, টিন কিংবা শনের ছাউনি দিয়ে তৈরি এসব ঘর ছিল অবস্থাসম্পন্ন গৃহস্থের আভিজাত্যের প্রতীক।

 

কাচারি ঘরকে কেন্দ্র করেই গ্রামীণ জীবনে গড়ে উঠত সামাজিক যোগাযোগের নানা পরিসর। সেখানে বসত আলোচনা, বিচার-সালিশ ও গল্প-আড্ডার আসর। বর্ষা মৌসুমে গ্রামের মানুষের উপস্থিতিতে আয়োজন করা হতো পুঁথিপাঠের আসর। দূর-দূরান্ত থেকে আসা পথচারীরা সেখানে সাময়িক বিশ্রাম নিতেন। বিপদে পড়লে রাতযাপনের সুযোগও পেতেন। অতিথিদের জন্য বাড়ির ভেতর থেকে খাবার পাঠানো হতো। অনেক বাড়িতে আবাসিক গৃহশিক্ষক বা লজিং মাস্টারের থাকার ব্যবস্থাও ছিল কাচারি ঘরে। কোনো কোনো কাচারি ঘর সকালে শিশুদের মক্তব হিসেবেও ব্যবহৃত হতো।

 

ইতিহাসের বিভিন্ন বর্ণনায় কাচারি ঘরের সঙ্গে খাজনা আদায়ের ব্যবস্থার সম্পর্কের কথাও পাওয়া যায়। প্রচলিত তথ্য অনুযায়ী, ঈসা খাঁর আমলে কর্মচারীরা খাজনা আদায়ের কাজে কাচারি ঘর ব্যবহার করতেন। জমিদারি আমলেও গ্রামের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বাড়ির সামনের কাচারি ঘরে খাজনা আদায়ের কার্যক্রম পরিচালিত হতো। সময়ের পরিবর্তনে সেই ব্যবহার ও প্রয়োজনীয়তা কমে যাওয়ায় গ্রামবাংলার পরিচিত এই স্থাপনা এখন আর আগের মতো চোখে পড়ে না।

 

বরিশালের বিভিন্ন গ্রামীণ জনপদে অতীতের অবস্থাসম্পন্ন গৃহস্থ ও গ্রাম্য মোড়লদের বাড়ির বাইরে এখনো কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে কিছু কাচারি ঘর। অনেক পরিবার পূর্বপুরুষের স্মৃতি ও ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে ঘরগুলো সংস্কার করে টিকিয়ে রেখেছেন। আবার কোথাও কোথাও দীর্ঘদিনের অযত্ন ও অবহেলায় এগুলো ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।

 

বরিশালের গৌরনদী উপজেলার গেরাকুল ও কাছেমাবাদ গ্রামে এমন দুটি ঐতিহ্যবাহী কাচারি ঘরের সন্ধান পাওয়া গেছে। এর মধ্যে গেরাকুল গ্রামের ঐতিহ্যবাহী মিঞাবাড়ির সামনে এখনো দাঁড়িয়ে রয়েছে একটি পুরোনো কাচারি ঘর। তবে সংস্কারের অভাবে ঘরটি বর্তমানে অযত্ন-অবহেলায় পড়ে আছে।

 

গ্রামের প্রবীণ ব্যক্তিদের ভাষ্য অনুযায়ী, মিঞাবাড়ির সন্তান গোলাম মানিক মিঞা স্থানীয়দের কাছে ‘বড় মিঞা’ নামে পরিচিত ছিলেন। দেশের বিভিন্ন খ্যাতনামা ব্যক্তির সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। তাঁর আমলেই মিঞাবাড়ির বসতঘরের কিছুটা বাইরে নির্মিত কাচারি ঘরটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র হয়ে ওঠে। গ্রামবাসীর ভাষ্যমতে, একসময় এই কাচারি ঘরে অতিথি হিসেবে এসেছিলেন বাংলার বাঘ শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক।

 

শত বছর আগে গোলাম মানিক মিঞার উদ্যোগে এই কাচারি ঘর থেকেই গ্রামের শিশু-কিশোরদের শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়েছিল বলে জানিয়েছেন স্থানীয় প্রবীণরা। পরবর্তী সময়ে মিঞাবাড়ির উত্তরসূরিদের দান করা জমিতে গড়ে ওঠে গেরাকুল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। বর্তমানে সেখানে রয়েছে দ্বিতল সুরম্য স্কুল ভবন ও সাইক্লোন শেল্টার।

 

শুধু শিক্ষা কার্যক্রম নয়, তৎকালীন মাহিলাড়া ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রের কার্যক্রমও শুরু হয়েছিল এই কাচারি ঘর থেকে। পরে মিঞাবাড়ির সম্পত্তিতেই স্বাস্থ্যকেন্দ্রের জন্য নির্মাণ করা হয় দুটি স্থায়ী পাকা ভবন। ১৯৯৩ সালে গেরাকুল বেগম আখতারুন্নেছা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের যাত্রাও শুরু হয় এই কাচারি ঘর থেকে। পরবর্তী সময়ে মিঞাবাড়ির সম্পত্তিতে গড়ে ওঠা বিদ্যালয়টি বর্তমানে তিনতলা ভবনে পরিচালিত হচ্ছে। সেখানে পড়াশোনা করছে সহস্রাধিক শিক্ষার্থী। একইভাবে এই কাচারি ঘর থেকে শুরু হওয়া মক্তবের কার্যক্রম বর্তমানে মিঞাবাড়ির দ্বিতল জামে মসজিদে পরিচালিত হচ্ছে।

 

সামনে বারান্দা থাকা মিঞাবাড়ির এই কাচারি ঘরকে ঘিরে গ্রামবাসীর রয়েছে অসংখ্য স্মৃতি। বিশেষ করে গোলাম মানিক মিঞার জীবদ্দশায় ঘরটি ছিল এলাকার মানুষের সামাজিক যোগাযোগ ও বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ স্থান। তাঁর মৃত্যুর পর বাড়িটির আগের জৌলুস অনেকটাই কমে গেছে। পরিবারের অধিকাংশ সদস্য বরিশাল শহর, ঢাকা ও দেশের বাইরে বসবাস করায় বাড়ির অন্যান্য স্থাপনার পাশাপাশি স্মৃতিবিজড়িত কাচারি ঘরটিও দীর্ঘদিন ধরে অযত্নে পড়ে রয়েছে। সংস্কারের অভাবে দিন দিন এটি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে।

 

অন্যদিকে, গৌরনদীর কাছেমাবাদ গ্রামের হাই মার্কেটসংলগ্ন দক্ষিণ পাশে রয়েছে ঐতিহ্যবাহী মুন্সীবাড়ি, যা স্থানীয়ভাবে আকন বাড়ি নামেও পরিচিত। বাড়িটির স্বনামধন্য ব্যক্তি মরহুম এরফান মুন্সীর আমলে নির্মিত প্রায় শত বছরের

এই পোস্টটি শেয়ার করুন...

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ ...

© All rights reserved © 2021
Developed By Engineerbd.net
EngineerBD-Jowfhowo