নিউজ ডেস্ক :: মশার বংশবিস্তার নিয়ন্ত্রণে বিদেশি গাপ্পিকে ছাড়িয়ে দেশীয় নাপিত খয়রা
মশার বংশ বিস্তার নিয়ন্ত্রণে বিদেশি গাপ্পি মাছের চেয়ে দেশীয় নাপিত খয়রা বেশি কার্যকর বলে উঠে এসেছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি)-এর এক গবেষণায়।
গবেষণায় দেখানো হয়েছে, নাপিত খয়রা মাছ ২৪ ঘণ্টায় গড়ে মশার প্রায় ৯৪টি মশার লার্ভা খেয়েছে।
একই সময় গাপ্পি মাছ খেয়েছে গড়ে ৫৬টির মতো লার্ভা। এ ছাড়া পরীক্ষায় চার প্রজাতির মাছই দূষিত পানিতে ১০ দিন পর্যন্ত বেঁচে ছিল।
তবে বাস্তব পরিবেশে এসব মাছের কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে দীর্ঘমেয়াদি মাঠপর্যায়ের গবেষণার প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন গবেষকরা।
গবেষণায়পরিচালনায় নেতৃত্ব দেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার।
এতে তিনটি দেশীয় মাছ নাপিত খয়রা, জেব্রাফিশ ও ব্লু পাঞ্চাক্সের সঙ্গে বিদেশি গাপ্পি মাছের মশার লার্ভা খাওয়ার সক্ষমতা তুলনা করা হয়। পাশাপাশি দূষিত পানিতে মাছগুলোর টিকে থাকার ক্ষমতা এবং অন্য খাবারের উপস্থিতিতে মশার লার্ভার প্রতি তাদের খাদ্যপছন্দও পরীক্ষা করা হয়।
গবেষণার জন্য ঢাকার সাভার এলাকার বিভিন্ন নর্দমা থেকে মশার লার্ভা সংগ্রহ করা হয়। গবেষণাগার ও সেমিফিল্ড পর্যায়ে পরিচালিত পরীক্ষায় প্রতিটি মাছকে আলাদা পাত্রে রেখে স্বাভাবিক ও দূষিত পানিতে তাদের লার্ভা খাওয়ার সক্ষমতা যাচাই করা হয়।
প্রতিটি পাত্রে কিউলেক্স মশার তৃতীয় পর্যায়ের ১০০টি লার্ভা দেওয়া হয়। ২৪ ঘণ্টা পর অবশিষ্ট লার্ভা গণনা করে মাছের খাবারগ্রহণের পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়।
পরীক্ষার ফল অনুযায়ী, স্বাভাবিক পানিতে নাপিত খয়রা গড়ে ৯৪ দশমিক ৫টি এবং দূষিত পানিতে ৯৩ দশমিক ৭৫টি লার্ভা খেয়েছে। জেব্রাফিশের ক্ষেত্রে এ সংখ্যা যথাক্রমে ৮৭ ও ৮৬ দশমিক ২৫টি। আর ব্লু পাঞ্চাক্স খেয়েছে ৮০ দশমিক ৭৫ ও ৭৮ দশমিক ৭৫টি।
অন্যদিকে গাপ্পি মাছ স্বাভাবিক পানিতে গড়ে ৫৬ দশমিক ৫টি এবং দূষিত পানিতে ৬১ দশমিক ৫টি লার্ভা খেয়েছে। অর্থাৎ উভয় পরিবেশেই লার্ভা খাওয়ার সক্ষমতায় অন্য তিন প্রজাতির চেয়ে এগিয়ে ছিল নাপিত খয়রা।
গবেষণায় আরো দেখা যায়, স্বাভাবিক ও দূষিত পানিতে চার প্রজাতির মাছের লার্ভা খাওয়ার হারের মধ্যে পরিসংখ্যানে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য পাওয়া যায়নি। এতে ধারণা পাওয়া যায়, পরীক্ষার নির্দিষ্ট পরিবেশে মাছগুলো দূষিত পানিতেও মশার লার্ভা খেতে সক্ষম।
গবেষণার আরেকটি অংশে লার্ভার পাশাপাশি অন্য খাবার থাকলে মাছগুলো কোনটি বেশি পছন্দ করে, তা পরীক্ষা করা হয়। এ জন্য দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ পর্যায়ের মশার লার্ভা, টিউবিফেক্স কৃমি ও কৃত্রিম মাছের খাবার ব্যবহার করা হয়।
দেখা যায়, নাপিত খয়রা, জেব্রাফিশ ও ব্লু পাঞ্চাক্স অন্য খাবারের তুলনায় মশার লার্ভার প্রতি বেশি আগ্রহ দেখিয়েছে। ব্লু পাঞ্চাক্সের পছন্দ ছিল তৃতীয় পর্যায়ের লার্ভা, আর নাপিত খয়রা বেশি পছন্দ করেছে দ্বিতীয় পর্যায়ের লার্ভা।
তবে গাপ্পি মাছের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কোনো খাবারের প্রতি উল্লেখযোগ্য পছন্দ দেখা যায়নি। কৃত্রিম খাবারের প্রতিও তাদের আগ্রহ ছিল।
দূষিত পানিতে মাছগুলোর টিকে থাকার সক্ষমতা যাচাইয়ে ১০ দিন ধরে পরীক্ষা চালানো হয়। এতে চার প্রজাতির সব মাছই বেঁচে ছিল। এ ছাড়া জেব্রাফিশ ও ব্লু পাঞ্চাক্সের ওজনও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তবে দূষিত পানিতে মাছগুলো কিছুটা নিস্তেজ হয়ে পড়েছিল।
গবেষকরা বলছেন, স্বল্পমেয়াদি এ পরীক্ষায় মাছগুলোর বেঁচে থাকার তথ্যকে দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত সহনশীলতার চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না।
গবেষণায় বলা হয়েছে, ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া ও ফাইলেরিয়াসহ বিভিন্ন মশাবাহিত রোগ জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি। এসব রোগের বাহক মশা নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘদিন ধরে রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহার করা হচ্ছে।
তবে এর অতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারে মশার মধ্যে কীটনাশক প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি পরিবেশ, মানুষ ও উপকারী প্রাণীর ওপরও বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ কারণে মশার লার্ভা খেয়ে বংশবিস্তার নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম মাছকে পরিবেশবান্ধব জৈবিক নিয়ন্ত্রণের সম্ভাবনাময় উপায় হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।বাংলাদেশে অতীতে মশা নিয়ন্ত্রণে বিদেশি গাপ্পি মাছ ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনও বিভিন্ন সময় নর্দমায় গাপ্পি মাছ ছেড়েছে। তবে বর্তমান গবেষণার ফল বলছে, লার্ভা খাওয়ার সক্ষমতায় কয়েকটি দেশীয় মাছ গাপ্পির চেয়ে এগিয়ে থাকতে পারে। দেশীয় প্রজাতি ব্যবহারের ক্ষেত্রে স্থানীয় জীববৈচিত্র্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যদিকে বিদেশি মাছের অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার স্থানীয় বাস্তুতন্ত্রের জন্য ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে বলে গবেষণার আলোচনায় উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে গবেষকরা বলছেন, গবেষণাগার ও সেমিফিল্ডের ফল সরাসরি বাস্তব পরিবেশে প্রয়োগের নিশ্চয়তা দেয় না। নর্দমা ও জলাশয়ের পানির গুণাগুণ, অক্সিজেনের পরিমাণ, পানির প্রবাহ, অন্যান্য খাবারের প্রাপ্যতা এবং মাছের প্রজনন ও টিকে থাকার সক্ষমতা মাঠপর্যায়ে কার্যকারিতাকে প্রভাবিত করতে পারে। তাই বড় পরিসরে ব্যবহারের আগে বিভিন্ন ধরনের নর্দমা ও জলাশয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরীক্ষা চালানো প্রয়োজন।
গবেষণায় নাপিত খয়রাকে মশার লার্ভা নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে সম্ভাবনাময় প্রজাতি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। পাশাপাশি জেব্রাফিশ ও ব্লু পাঞ্চাক্সও জৈবিক নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে বলে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। তবে কোন পরিবেশে কোন প্রজাতির মাছ ব্যবহার সবচেয়ে উপযোগী, তা আরো গবেষণার মাধ্যমে নির্ধারণ করতে হবে।
গবেষকদের মতে, মশা নিয়ন্ত্রণে কোনো একক পদ্ধতির ওপর নির্ভর না করে সমন্বিত বাহক ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে জৈবিক নিয়ন্ত্রণের সুযোগ কাজে লাগানো যেতে পারে। মাঠপর্যায়ে দেশীয় মাছের কার্যকারিতা প্রমাণিত হলে তা রাসায়নিক কীটনাশকের ওপর নির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি স্থানীয় জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণেও ভূমিকা রাখতে পারে