স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা :: সারাক্ষণ ক্লান্ত লাগা কিংবা স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া, কোনও ভয়াবহ রোগে ভুগছেন না তো?
পর্যাপ্ত ঘুমের পরও যদি শরীর চাঙ্গা না লাগে, তাহলে এটি সাধারণ ক্লান্তি নাও হতে পারে। ভিটামিন বি১২-এর অভাবে মেগালোব্লাস্টিক অ্যানিমিয়া হয়, ফলে শরীরের কোষে প্রয়োজনীয় অক্সিজেন পৌঁছায় না। ছবি: সংগৃহীত
সারাক্ষণ ক্লান্ত লাগা, মনোযোগ ধরে রাখতে না পারা, অকারণে মন খারাপ হয়ে যাওয়া এসব উপসর্গ আমরা প্রায়ই দৈনন্দিন জীবনের চাপ বা ঘুমের ঘাটতির ঘাড়ে চাপিয়ে দিই। কিন্তু চিকিৎসকদের মতে, এই সমস্যাগুলোর পেছনে লুকিয়ে থাকতে পারে ভিটামিন বি১২-এর অভাব। আর এটা অনেকসময় ভয়াবহ সমস্যার কারণ হয়ে উঠে।
গবেষণা বলছে, ভারতীয় উপমহাদেশের প্রায় ১৫ থেকে ৫০ শতাংশ মানুষ ভিটামিন বি১২-এর ঘাটতিতে ভুগছেন। অথচ এই ভিটামিন শরীরে রক্তকণিকা তৈরি, স্নায়ুর সুরক্ষা এবং মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কার্যক্রমের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন এই ঘাটতি অবহেলা করলে শারীরিক সমস্যার পাশাপাশি মানসিক ও স্নায়বিক জটিলতাও দেখা দিতে পারে।
ভিটামিন বি১২ খুবই গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এটি শরীরকে সুস্থ লোহিত রক্তকণিকা তৈরি করতে সাহায্য করে। স্নায়ুর আবরণ (মাইলিন শিথ) রক্ষা করে। পাশাপাশি মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা ও স্মৃতিশক্তি বজায় রাখে। এই ভিটামিনের ঘাটতি হলে শরীর ধীরে ধীরে ভেঙে পড়তে শুরু করে, যার লক্ষণ শুরুতে বোঝা না গেলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে স্পষ্ট হয়।
ভিটামিন বি১২-এর ঘাটতির ১০টি লক্ষণ যা অবহেলা করা উচিত নয়
১. সবসময় ক্লান্তি ও শক্তিহীনতা
পর্যাপ্ত ঘুমের পরও যদি শরীর চাঙ্গা না লাগে, তাহলে এটি সাধারণ ক্লান্তি নাও হতে পারে। ভিটামিন বি১২-এর অভাবে মেগালোব্লাস্টিক অ্যানিমিয়া হয়, ফলে শরীরের কোষে প্রয়োজনীয় অক্সিজেন পৌঁছায় না। আর এটাই ক্লান্টি করে দেয়।
২. ত্বক ফ্যাকাশে বা চোখ-চামড়ায় হলদে ভাব
লোহিত রক্তকণিকা ঠিকভাবে তৈরি না হলে ত্বক ফ্যাকাশে দেখায়। আবার বিলিরুবিন বেড়ে গেলে জন্ডিসের মতো হলুদ ভাবও দেখা দিতে পারে।
৩. হাত-পায়ে ঝিনঝিনি ও অবশভাব
হাত-পায়ে পিন ফোটার মতো অনুভূতি বা অবশ হয়ে আসা স্নায়ু ক্ষতির প্রাথমিক লক্ষণ। এটি দীর্ঘদিন থাকলে স্থায়ী সমস্যায় রূপ নিতে পারে।
দীর্ঘদিনের বি১২ ঘাটতি অপটিক নার্ভে প্রভাব ফেলতে পারে, যার ফলে চোখে ঝাপসা দেখা বা দৃষ্টিশক্তি কমে যায়। তাই হঠাৎ দৃষ্টিশক্তি ঝাপসা হলে অবহেলা করা যাবে না। ছবি: সংগৃহীত
৪. হাঁটতে সমস্যা ও ভারসাম্য হারানো
ভিটামিন বি১২-এর অভাবে স্পাইনাল কর্ড ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, ফলে হাঁটার সময় ভারসাম্য নষ্ট হয় এবং পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
৫. জিহ্বা লাল হওয়া ও মুখে ঘা
জিহ্বা ফুলে যাওয়া, জ্বালাপোড়া করা বা মুখে ঘা হওয়া অনেক সময় বি১২ ঘাটতির স্পষ্ট লক্ষণ। এটা অনেকসময় ভয়াবহ হয়ে যায়।
৬. দৃষ্টিশক্তি ঝাপসা হয়ে যাওয়া
দীর্ঘদিনের বি১২ ঘাটতি অপটিক নার্ভে প্রভাব ফেলতে পারে, যার ফলে চোখে ঝাপসা দেখা বা দৃষ্টিশক্তি কমে যায়। তাই হঠাৎ দৃষ্টিশক্তি ঝাপসা হলে অবহেলা করা যাবে না।
৭. মেজাজ খিটখিটে ও বিষণ্নতা
হঠাৎ বিষণ্ন লাগা, অকারণে রাগ বা উদ্বেগ বেড়ে যাওয়া এসবের পেছনে শুধু মানসিক চাপ নয়, ভিটামিন বি১২-এর ঘাটতিও দায়ী হতে পারে।
৮. স্মৃতিশক্তি দুর্বল হয়ে যাওয়া
নাম, তারিখ বা পরিচিত বিষয় ভুলে যাওয়া, মনোযোগ ধরে রাখতে না পারা এসব লক্ষণ বয়সের আগেই দেখা দিলে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।
৯. শ্বাসকষ্ট ও মাথা ঘোরা
হিমোগ্লোবিন কমে গেলে শরীর পর্যাপ্ত অক্সিজেন পায় না। এর ফলেই অল্প কাজেই শ্বাস নিতে কষ্ট হয় বা মাথা ঘোরে।
১০. অ্যানিমিয়া ও হিমোগ্লোবিন কমে যাওয়া
ভিটামিন বি১২-এর অভাবে শরীর বড় কিন্তু অকার্যকর লোহিত রক্তকণিকা তৈরি করে, যা ঠিকভাবে কাজ করতে পারে না।
খাদ্যতালিকায় ডিম, দুধ, দই, মাছ, মাংস ও ফোর্টিফায়েড খাবার যুক্ত করা দরকার ভিটামিন বি১২ ঘাটতি দেখা দিলে।
চিকিৎসা ও প্রতিরোধের উপায়
চিকিৎসকের পরামর্শে ভিটামিন বি১২ সাপ্লিমেন্ট বা ইনজেকশন
খাদ্যতালিকায় ডিম, দুধ, দই, মাছ, মাংস ও ফোর্টিফায়েড খাবার যুক্ত করা
নিরামিষভোজীদের নিয়মিত পরীক্ষা ও সাপ্লিমেন্ট নেওয়া জরুরি
বছরে অন্তত একবার রুটিন ব্লাড টেস্ট করা ভালো
ভিটামিন বি১২-এর ঘাটতি অনেক সময় নীরবে শরীরে ক্ষতি করে, যার লক্ষণগুলো আমরা ব্যস্ত জীবনে সহজেই উপেক্ষা করি। অথচ এই ঘাটতি সময়মতো ধরা না পড়লে তা শারীরিক দুর্বলতার পাশাপাশি স্নায়ু ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। তবে ভিটামিন বি১২-এর ঘাটতি সময়মতো ধরা পড়লে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণযোগ্য।
সূত্র:এনডিটিভি