মা ইলিশ’ রক্ষার অভিযানে লাখ লাখ টাকার বাণিজ্যের অভিযোগ, কাঠগড়ায় নৌ পুলিশ

রিপোর্টার নাম
  • আপডেট টাইমঃ Saturday, October 24, 2026,
  • 36 সংবাদটি পঠিক হয়েছে

নিউজ ডেস্ক :: মা ইলিশ’ রক্ষার অভিযানে লাখ লাখ টাকার বাণিজ্যের অভিযোগ, কাঠগড়ায় নৌ পুলিশ

১০–২০ হাজার টাকায় নদীতে মাছ ধরার সুযোগ, টাকা দিয়ে জেলে ও জাল ছাড়ানোর অভিযোগ

মা ইলিশ রক্ষায় তেঁতুলিয়া নদীতে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা চলছে। ইলিশের প্রজনন নির্বিঘ্ন করতে নদীতে দিনরাত অভিযান চালানোর কথা নৌ পুলিশ ও মৎস্য বিভাগের। কিন্তু এই অভিযান ঘিরেই পটুয়াখালীর বাউফলে উঠেছে গুরুতর অনিয়ম ও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ। অভিযোগ রয়েছে, ১০ থেকে ২০ হাজার টাকার বিনিময়ে জেলেদের নদীতে মাছ ধরার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। আটক জেলেদের কারও কারও কাছ থেকে টাকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে। এমনকি অভিযানে জব্দ করা জাল ও মাছ গোপনে বিক্রির অভিযোগও উঠেছে কালাইয়া নৌ পুলিশ ফাঁড়ির কয়েকজন সদস্যের বিরুদ্ধে।

তেঁতুলিয়া নদীর চরফেডারেশন, বাতিরখাল, চরওয়াঢেল, খানকা, চরকলাইয়া ও চর শৌলা পয়েন্ট ঘিরে কয়েক দিনের অনুসন্ধানে এসব অভিযোগ সামনে এসেছে। স্থানীয় জেলে, নদীপারের বাসিন্দা এবং অভিযোগকারীদের বক্তব্যে উঠে এসেছে অর্থ লেনদেনের একাধিক ঘটনা। তবে অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যরা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

গত ৮ অক্টোবর থেকে তেঁতুলিয়া নদীতে মা ইলিশ সংরক্ষণে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা শুরু হয়, যা ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত চলার কথা। নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে নৌ পুলিশ ও মৎস্য বিভাগের যৌথ অভিযানের কথা থাকলেও স্থানীয়দের অভিযোগ, কালাইয়া নৌ পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা অনেক ক্ষেত্রে এককভাবে অভিযান পরিচালনা করছেন। এসব অভিযানে নেতৃত্ব দিচ্ছেন ফাঁড়ির দায়িত্বপ্রাপ্ত ইনচার্জ এসআই মো. মনিরুজ্জামান তালুকদার।

অভিযোগ রয়েছে, অভিযানের শুরু থেকেই একশ্রেণির জেলের সঙ্গে আর্থিক চুক্তির মাধ্যমে নদীতে মাছ ধরার সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে। ট্রলারপ্রতি ১০ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত লেনদেনের অভিযোগ করেছেন স্থানীয় কয়েকজন জেলে ও নদীপারের বাসিন্দা।

গত ১৯ অক্টোবর বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে তেঁতুলিয়া নদীর চরফেডারেশন ও দক্ষিণ চরওয়াঢেলের মাঝামাঝি এলাকায় সরেজমিন পর্যবেক্ষণে একাধিক মাছ ধরার ট্রলার দেখা যায়। অভিযোগ অনুযায়ী, নৌ পুলিশের একটি টহল ট্রলার ওই এলাকায় দুই ঘণ্টার বেশি সময় অবস্থান করছিল। কাছাকাছি দূরত্বে কয়েকটি জেলেট্রলারকে নদীতে জাল ফেলতে এবং মাছ ধরে চলে যেতে দেখা যায়।

নিষেধাজ্ঞার মধ্যে পুলিশের টহল ট্রলারের কাছাকাছি এমন দৃশ্য দেখে অভিযান পরিচালনার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে ওই সময় মাছ ধরতে দেখা যাওয়া জেলেরা কোনো আর্থিক চুক্তির আওতায় ছিলেন কি না, তা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

স্থানীয় জেলে ও নদীপারের বাসিন্দাদের দাবি, কিছু জেলে আগে থেকেই অভিযানের গতিবিধি জানতে পারেন। ফলে পুলিশ নদীতে নামার আগেই তাঁরা নিরাপদ স্থানে সরে যান। তাঁদের অভিযোগ, চরব্যারেট, বাতিরখাল, খানকা, দেবীরচর, চরকলাইয়া ও বগী-তুলাতলা এলাকার প্রায় অর্ধশত ট্রলারের জেলেদের সঙ্গে আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে সমঝোতা হয়েছে।

অভিযোগের বিষয়ে কালাইয়া নৌ পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই মো. মনিরুজ্জামান তালুকদার বলেন, টাকার বিনিময়ে মাছ ধরার সুযোগ দেওয়ার অভিযোগ সঠিক নয়। তবে টহলের কাছাকাছি জেলেদের মাছ ধরার বিষয়ে তিনি বলেন, অনেক অসচ্ছল মানুষ নদীতে জাল ফেলেন, মানবিক কারণে তাঁদের ধরা হয় না।

অভিযান ঘিরে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে আটক জেলে ও জব্দ করা সরঞ্জাম নিয়ে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মাছ ধরার সময় জেলেদের আটক করার পর কখনো নদীর মধ্যেই অর্থ লেনদেনের আলোচনা হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, ৫ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত নিয়ে কোনো কোনো জেলেকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। জব্দ করা জালও ১ হাজার ৫০০ থেকে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। জব্দ মাছ হালি হিসেবে ৪০০ থেকে ৬ হাজার টাকায় বিক্রির অভিযোগও করেছেন কয়েকজন।

অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন, এসব লেনদেনে কালাইয়া নৌ পুলিশ ফাঁড়ির কয়েকজন সদস্য, ট্রলারচালক জালাল গাজী এবং তাঁর ভাই ফিরোজ গাজীর সম্পৃক্ততা রয়েছে। তবে অভিযোগের প্রতিটি লেনদেনের স্বাধীন প্রমাণ বা পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি।

কালাইয়া নৌ পুলিশ ফাঁড়ির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, অভিযান শুরুর পর থেকে ২১ অক্টোবর দুপুর পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মাছ ধরার অভিযোগে ৪৪ জন জেলেকে আটক করা হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে ২২টি ভ্রাম্যমাণ আদালত এবং ১১টি নিয়মিত মামলার মাধ্যমে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। এ সময় বিপুল পরিমাণ কারেন্ট জাল ও মাছ জব্দের কথাও জানিয়েছে পুলিশ। পুলিশের দাবি, জব্দ করা জাল পুড়িয়ে ধ্বংস এবং মাছ এতিমখানায় বিতরণ করা হয়েছে।

তবে আটক ও সাজাপ্রাপ্তদের সরকারি নথি, জব্দ করা জালের পরিমাণ, ধ্বংসের কার্যবিবরণী এবং মাছ বিতরণের রসিদ যাচাই করা গেলে অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে।

গত ১৬ অক্টোবর সকালে নিষেধাজ্ঞার মধ্যে তেঁতুলিয়া নদীতে জাল ফেলতে গিয়ে চন্দ্রদ্বীপ ইউনিয়নের জেলে নুর আলম আটক হন বলে অভিযোগ উঠেছে। পরে ফিরোজ গাজীর মাধ্যমে ১০ হাজার টাকা দিয়ে তিনি মুক্তি পান বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি

একইভাবে গত ১৮ অক্টোবর ভোরে তেঁতুলিয়া নদীর চরদিয়ারা এলাকা থেকে চারটি ট্রলারসহ কয়েকজন জেলেকে আটক করা হয় বলে অভিযোগকারীরা জানিয়েছেন। তাঁদের দাবি, ট্রলারপ্রতি ৫ হাজার টাকা হিসেবে মোট ২০ হাজার টাকার বিনিময়ে তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়।

মুক্তি পাওয়া জেলেদের একজন রাকিব (ছদ্মনাম)। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, চারটি ছোট ইঞ্জিনচালিত ট্রলারসহ তাঁদের আটক করা হয়েছিল। পরে ট্রলারপ্রতি ৫ হাজার টাকা করে মোট ২০ হাজার টাকায় ছেড়ে দেওয়ার সমঝোতা হয়। তাঁদের কাছে নগদ টাকা না থাকায় নৌ পুলিশের ট্রলারচালক জালাল গাজীর ভাই ফিরোজ গাজীর জিম্মায় তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়। পরে তাঁরা ওই টাকা পরিশোধ করেন বলে দাবি করেন রাকিব।

একই দিন চরদিয়ারা এলাকার জেলে শাহিন, হারুন গাজীসহ কয়েকজনকে জালসহ আটক করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন। তাঁদের অভিযোগ, হারুন গাজীসহ দুজনকে ৬ হাজার টাকার বিনিময়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। তবে শাহিনকে মৎস্য সংরক্ষণ আইনে মামলার মাধ্যমে আদালতে পাঠানো হয়।

শাহিনের অভিযোগ, তাঁকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য নৌ পুলিশের এএসআই কবির

এই পোস্টটি শেয়ার করুন...

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ ...

© All rights reserved © 2021
Developed By Engineerbd.net
EngineerBD-Jowfhowo