আন্তর্জাতিক ডেস্ক :: ইউরোপজুড়ে জেন-জির বিক্ষোভ, উঠেছে সরকার পতনের ডাক
ইউরোপের বিভিন্ন দেশে শিক্ষা, আবাসনসংকট ও জীবনযাত্রার বাড়তি ব্যয় নিয়ে বিক্ষোভে নেমেছেন তরুণেরা। ফ্রান্স, ইতালি, স্পেন, পর্তুগাল, গ্রিস ও সার্বিয়াসহ বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়েছে এই অসন্তোষ। আন্দোলনের সামনের সারিতে রয়েছেন জেনারেশন জেড বা জেন–জির তরুণেরা। তাঁদের অভিযোগ, বাড়তি ব্যয়ের চাপে শিক্ষা, আবাসন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ ক্রমেই সীমিত হয়ে আসছে।
বিভিন্ন দেশে তরুণদের এই বিক্ষোভ এখন শুধু জীবনযাত্রার ব্যয় কিংবা শিক্ষার মান নিয়ে ক্ষোভের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; কোথাও কোথাও তা সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নিয়েছে। বিক্ষোভকারীদের একাংশ সরকার পতনের ডাকও দিয়েছেন। দেশভেদে আন্দোলনের কারণ আলাদা হলেও তরুণদের মধ্যে জমে থাকা অসন্তোষ ইউরোপের বিভিন্ন সরকারের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
কোথাও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দুরবস্থা ও শিক্ষকসংকট, কোথাও আবাসনসংকট এবং বাড়িভাড়ার ঊর্ধ্বগতি আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটিয়েছে। আবার কোথাও শিক্ষা খাতে সরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো এবং জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর দাবিতে রাজপথে নেমেছেন শিক্ষার্থীরা। তরুণদের আশঙ্কা, আগের প্রজন্মের মতো সুযোগ-সুবিধা পাওয়া তাঁদের জন্য ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে।
স্পেনে আবাসনসংকট নিয়ে ক্ষোভের একটি বড় উপলক্ষ হয়ে ওঠে ৮৭ বছর বয়সী মারিকারমেন অ্যাবাসকালকে তাঁর বাড়ি থেকে উচ্ছেদের ঘটনা। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে বাড়িভাড়া বৃদ্ধি ও আবাসনের ক্রমবর্ধমান ব্যয় নিয়ে নতুন করে প্রতিবাদ শুরু হয়। আবাসনসংকটের চাপ তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে গুরুত্ব পেয়েছে শিক্ষকসংকট, বিদ্যালয়ের দুরবস্থা, জীবনযাত্রার বাড়তি ব্যয় ও সরকারি ব্যয় সংকোচনের বিরোধিতা। শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি শিক্ষকেরাও আন্দোলনে যুক্ত হয়েছেন। বিক্ষোভের বিভিন্ন পর্যায়ে সহিংসতা, লুটপাট ও গ্রেপ্তারের ঘটনাও ঘটেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আলবেনিয়ায় কয়েক মাস ধরে দফায় দফায় শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ চলছে। বিলাসবহুল স্থাপনা নির্মাণের একটি পরিকল্পনাকে কেন্দ্র করে সেখানে আন্দোলনের সূত্রপাত। ওই প্রকল্পের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা ও উপদেষ্টা জ্যারেড কুশনারের সম্পৃক্ততার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।
বিক্ষোভের প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে এক দেশ থেকে অন্য দেশে। ইতালি ও গ্রিসের তরুণেরা তাঁদের আন্দোলনে ফ্রান্সের বিক্ষোভকারীদের প্রতি সংহতি জানিয়েছেন। স্পেনে আবাসন নিয়ে শুরু হওয়া প্রতিবাদের ঢেউ পর্তুগালেও ছড়িয়েছে। বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থী সংগঠনগুলো নিজেদের অভিজ্ঞতা ও আন্দোলনের কৌশল নিয়ে যোগাযোগ রাখছে।
ফ্রান্সের শিক্ষার্থী সংগঠন ইউএনইএফের ভাইস প্রেসিডেন্ট অ্যালিস দ্য ব্রিতো সিএনএনকে বলেন, দেশগুলোর আন্দোলনে পার্থক্যের চেয়ে মিলই বেশি। শিক্ষা, বিশ্ববিদ্যালয় ও তরুণদের জন্য বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি জীবনযাত্রা ও আবাসনের ব্যয় কমানোর দাবি রয়েছে এসব আন্দোলনে।
ইতালির ছাত্রনেতা সাবরিনা ব্রিজোলাও নিরাপদ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থান, সরকারি স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের দাবি জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্যে তরুণদের দৈনন্দিন জীবনের অনিশ্চয়তা ও মৌলিক সেবার ঘাটতির বিষয়টি উঠে এসেছে।
গ্রিসেও শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর দাবিতে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকেরা বিক্ষোভ করেছেন। এথেন্সসহ বিভিন্ন স্থানে আয়োজিত কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া বিক্ষোভকারীরা বিনা মূল্যে সরকারি শিক্ষার দাবিতে স্লোগান দেন। ইতালির রাজধানী রোমে ৭ অক্টোবর একটি হাইস্কুলে বিক্ষোভ শুরু হয়। আন্দোলনকারীদের বিবৃতিতেও ফ্রান্সের আন্দোলনের প্রসঙ্গ উঠে আসে।
তবে ফ্রান্সের সঙ্গে ইতালির পরিস্থিতির মিল নেই বলে দাবি করেছেন ইতালির শিক্ষামন্ত্রী জুসেপ্পে ভালদিতারা। ফ্রান্সে অভিবাসী পরিবারের দ্বিতীয় প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর সমস্যা বিক্ষোভে ভূমিকা রাখছে বলে দাবি করেছে দেশটির কট্টর ডানপন্থীরা। বিপরীতে ইতালিতে এ ধরনের সমস্যা নেই বলে মন্তব্য করেছেন ইতালির শিক্ষামন্ত্রী।
সব মিলিয়ে ইউরোপের তরুণদের বিক্ষোভে শিক্ষা, আবাসন, কর্মসংস্থান ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে জমে থাকা অসন্তোষ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এই ক্ষোভ কোথাও সরকারবিরোধী আন্দোলনের রূপ নিচ্ছে, কোথাও নির্দিষ্ট নীতির পরিবর্তনের দাবি তুলছে। তরুণদের এসব প্রতিবাদ ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সরকারকে তাঁদের দাবি ও সংকট মোকাবিলার কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।