নিজস্ব প্রতিবেদক :: বরিশালে শাপলার রাজ্যে নৌভ্রমণ, সাতলায় প্রতিদিন ছুটছেন হাজারো পর্যটক
সকালের রোদে টলটল পানি। তাতে ফুটে রয়েছে শাপলা। যেন বিছিয়ে রাখা হয়েছে লাল-সবুজ নকশিকাঁথা। ভোরের আলোয় সেই নকশিকাঁথার বুক চিরে এগিয়ে চলে ছোট ছোট নৌকা। বাতাসে দুলতে থাকা অগণিত শাপলা, মৃদু ঢেউ আর চারপাশে পাখির ডাক।
সবমিলিয়ে বরিশালের উজিরপুরের সাতলা বিল হয়ে ওঠে প্রকৃতির এক মায়াময় চিত্রকর্ম। এ যেন জলের বুকে ভেসে থাকা লাল শাপলার স্বর্গরাজ্য। তাইতো মায়াবী এ রূপের টানেই প্রতিবছর দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসেন হাজারো মানুষ।
তবে সাতলার এই সৌন্দর্য শুধু চোখ জুড়ানোর নয়, স্থানীয় মানুষের আয়েরও উৎস হয়ে উঠেছে। শাপলা দেখতে আসা পর্যটকদের নিয়ে অর্ধশতাধিক নৌকা চলে বিলে, শাপলা বিক্রি করে আয় করেন স্থানীয়রা।
নতুন সাজে সাতলার শাপলা বিল :
প্রকৃতির এই অপরূপ সৌন্দর্যের সঙ্গে এবার যুক্ত হচ্ছে নতুন সাজ। সাতলার শাপলার বিলকে আরও আকর্ষণীয় ও পর্যটকবান্ধব করে তুলতে প্রবেশদ্বারে নির্মাণ করা হচ্ছে দৃষ্টিনন্দন গেট ও ভিউ পয়েন্ট।
পাশাপাশি পর্যটকদের নৌভ্রমণ ও চলাচলের সুবিধায় ঘাটলাসহ বিভিন্ন অবকাঠামো তৈরির কাজও এগিয়ে চলছে। ফলে লাল শাপলার নকশিকাঁথার ওপর এখন আঁকা হচ্ছে সম্ভাবনাময় স্থানীয় অর্থনীতির নতুন ছবি।
উজিরপুর উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, গত বছর ১৫ লাখ ও চলতি বছর ৫ লাখ টাকার কাজ হচ্ছে। পটিবাড়ি ও মুড়িবাড়ি দুটি ভিউ পয়েন্ট। বর্তমানে মুড়িবাড়ি ভিউ পয়েন্টে তোরণ নির্মাণের কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে। প্রায় ৮০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। শুধু টাইলসের কাজ রয়েছে; যা চলতি সপ্তাহে শেষ হবে।
প্রথম পর্যায়ে প্রবেশপথ, ভিউ পয়েন্ট ও ঘাটলা নির্মাণ করা হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে পর্যটকদের বসার স্থান, নিরাপদ নৌযান চলাচল, স্যানিটেশন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ব্যবস্থাও করা হবে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা।
উপজেলা প্রশাসন সূত্রে আরো জানা গেছে, উজিরপুরের পর্যটন সম্ভাবনাকে জাতীয় পর্যায়ে তুলে ধরতে সাতলা বিলে দশ হাজার একরজুড়ে এসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিলের সৌন্দর্য নিয়ে স্থিরচিত্র ও ভিডিওচিত্র তৈরি এবং সামাজিক মাধ্যমে প্রচারের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় প্রশাসনের আশা, পরিকল্পিত এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে সাতলার শাপলার বিল আরও আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হবে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরেই সাতলার বিল পর্যটকদের কাছে আকর্ষণের কেন্দ্র হলেও পর্যাপ্ত অবকাঠামো না থাকায় নানা ভোগান্তিতে পড়তে হতো দর্শনার্থীদের। নতুন গেট, ভিউ পয়েন্ট ও ঘাটলা নির্মিত হলে সেই সমস্যা অনেকটাই কমবে।
স্থানীয় নৌকার মাঝি চয়ন হাওলাদার (৩৫) বলেন, শাপলা ফোটার সময় প্রতিদিন অনেক মানুষ আসে। পর্যটক বাড়লে নৌকা চালানো, খাবারের দোকান ও স্থানীয় পণ্য বিক্রি-সবকিছুর ব্যবসা বাড়বে। অনেক পরিবার এ থেকে আয় করতে পারবে।
বিল ঘিরে আয়ের উৎস
সাতলার লাল শাপলার বিল এখন শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্যের নকশিকাঁথা নয়, স্থানীয় মানুষের আয়েরও একটি মৌসুমি ক্ষেত্র। শাপলা ফোটার মৌসুমে বিলে পর্যটকদের ঘোরাতে চারটি স্পটে অর্ধশতাধিক নৌকা চলাচল করে। দিনে তাদের সম্মিলিত দৈনিক আয় দাঁড়ায় প্রায় ৫০ হাজার থেকে ৭৫ হাজার টাকা। জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত প্রায় পাঁচ মাস নৌকা চলাচলের হিসেব অনুযায়ী মৌসুমে মোট আয় হয় ৬০ থেকে ৯০ লাখ টাকা।
নৌকার মাঝি ইদ্রিস আলী বেপারী, নাসির উদ্দিন, সবুজ ঘরামী, লিয়াকত আলীসহ কয়েকজনে জানিয়েছেন, প্রতিদিন গড়ে দেড় থেকে দুই হাজার পর্যটক আসেন। শুক্র ও শনিবার এ সংখ্যা পাঁচ হাজার ছাড়িয়ে যায়।
শুধু নৌকা ভাড়াই নয়, বিলের লাল শাপলাও এখন স্থানীয় অর্থনীতির অংশ হয়ে উঠেছে। শাপলা তোলার কাজে নিয়োজিত রয়েছেন স্থানীয় শতাধিক পরিবার, যার একটি বড় অংশই নারী। দিনভর বিল থেকে শাপলা সংগ্রহ করে তারা গড়ে প্রতিদিন চার থেকে পাঁচশ’ টাকা পর্যন্ত আয় করছেন।
সংগ্রাহকদের কাছ থেকে পাইকাররা এসব শাপলা কিনে নিয়ে উজিরপুর, আগৈলঝাড়া, গৌরনদী, কোটালীপাড়া, বানারীপাড়া, বাবুগঞ্জ, বরিশাল শহরসহ বিভিন্ন হাটবাজারে প্রতিমুঠো ১০ থেকে ১৫ টাকায় বিক্রি করেন। এমনকি রাজধানীর বাজারেও পৌঁছে যায় সাতলার এই শাপলা। শাপলা তুলে দৈনিক মোট ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা, যা পুরো চার মাসের মৌসুমে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ লাখ টাকায় গিয়ে দাঁড়ায়।
তিনি আরও বলেন, প্রকৃতির নৈসর্গিক সৌন্দর্যেঘেরা এ বিলকে আরও দৃষ্টি নন্দন ও আকর্ষনীয় করে গড়ে তুলতে আধুনিক পর্যটনকেন্দ্র বিনির্মাণে ইতোমধ্যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পর্যায়ক্রমে পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়ন করে লাল শাপলার এ বিলকে দেশের অন্যতম পর্যটনকেন্দ্রে রূপান্তর করা হবে।
লাল শাপলার বিলকে দেশ-বিদেশের পর্যটকদের মাঝে ছড়িয়ে দিতে ব্যাপক পরিকল্পনা গ্রহন করে ইতোমধ্যে অধিকাংশ কাজ শেষ করে ব্যাপক প্রশংসা কুড়ানো উজিরপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. আলী সুজা বলেন, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অক্ষুণ্ন রেখেই সাতলার শাপলার বিলকে পর্যটকবান্ধব করে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি পর্যটকদের নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্যের বিষয়টি এখানে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, প্লাস্টিকের বর্জ্য যেন বিলের পানিতে ফেলা না হয়, সেজন্য প্রতিটি নৌকায় আমরা একটি করে বজ্য ফেলা ঝুড়ি দিয়েছি।
পর্যটকরা যেন কোনধরনের হয়রানির স্বীকার না হয়, সেকারনে উপজেলা প্রশাসনের একাধিক মনিটরিং টিম কাজ করছে। পাশাপাশি পর্যটকদের ক্ষনিকের বিশ্রামের জন্য এখানে একটি বিশ্রামাগার ও ওয়াসরুম নির্মান করা হয়েছে।
উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আরো বেশ কিছু পরিকল্পনা রয়েছে। যা পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হবে