নিজস্ব প্রতিবেদক :: বরিশাল-ভোলা সেতু হলে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ সহজ, হবে দক্ষিণাঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থায় নতুন দিগন্ত উন্মোচিত
বরিশাল-ভোলা সেতু নির্মিত হলে জাতীয় গ্রিডে প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের পথ সহজ হবে। একই সঙ্গে দক্ষিণাঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থায় নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে, বাড়বে শিল্পায়ন ও বিনিয়োগের সুযোগ।
সরকারের লক্ষ্য, ২০৩৩ সালের মধ্যে সেতুটির নির্মাণকাজ শেষ করা। এরমধ্যে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিপি) মডেলে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে আগ্রহ প্রকাশ করেছে জাপানের নির্মাণ প্রতিষ্ঠান মিয়াগাওয়া কেনসেটসু কনস্ট্রাকশন লিমিটেড।
বাংলাদেশ সেতু বিভাগ ও পিপিপি কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, রাজধানীতে অনুষ্ঠিত অষ্টম বাংলাদেশ-জাপান যৌথ পিপিপি প্ল্যাটফর্মের সভায় ভোলা-বরিশাল ও শরীয়তপুর-চাঁদপুর সেতু প্রকল্পকে নতুন অগ্রাধিকার প্রকল্প হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ওই সভায় মিয়াগাওয়া কেনসেটসু কনস্ট্রাকশন লিমিটেড দুটি সেতু নির্মাণে আনুষ্ঠানিকভাবে আগ্রহ প্রকাশ করে।
পিপিপি মডেলে বাস্তবায়নের জন্য প্রস্তাবিত দুটি প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৩ হাজার ৪২৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে শুধু ভোলা-বরিশাল সেতুর ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে ১৭ হাজার ৪৬৬ কোটি টাকা। পিপিপি নীতিমালা অনুযায়ী ভূমি অধিগ্রহণের ব্যয় বহন করবে বাংলাদেশ সরকার।
সেতু বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, প্রস্তাবিত ভোলা-বরিশাল সেতুর দৈর্ঘ্য হবে ১০ দশমিক ৮৬ কিলোমিটার।
নির্মাণ শেষ হলে এটি হবে দেশের দীর্ঘতম সেতু। দ্বীপজেলা ভোলার সঙ্গে বরিশালের স্থায়ী সড়ক যোগাযোগ প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি এটি দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নতুন গতি আনবে।
২০২৪ সালে সম্পন্ন হওয়া সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় বলা হয়েছে, সেতুটি চালু হলে দক্ষিণাঞ্চলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়বে, নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। আগামী ৩০ বছরে প্রকল্পটি দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্রায় শূন্য দশমিক ৮৬ শতাংশ অবদান রাখতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, সেতুটি নির্মিত হলে ভোলার গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের ক্ষেত্রে বিদ্যমান সীমাবদ্ধতা দূর হবে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, এতে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী হবে এবং গ্যাসভিত্তিক শিল্প সম্প্রসারণের সুযোগ বাড়বে।
সেতু বিভাগ ও পিপিপি কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তারা জানান, মিয়াগাওয়া এককভাবে অথবা অন্য জাপানি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথভাবে প্রকল্প বাস্তবায়নে অংশ নিতে পারে। তবে প্রতিষ্ঠানটিকে চূড়ান্তভাবে নির্বাচনের আগে ট্রানজিশন পরামর্শক নিয়োগ, সম্ভাব্যতা যাচাই এবং পরবর্তী ধাপে রিকোয়েস্ট ফর প্রপোজাল (আরএফপি) আহ্বান করা হবে। মূল্যায়ন শেষে নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করবে সরকার।
বাংলাদেশে মিয়াগাওয়ার স্থানীয় অংশীদার হিসেবে কাজ করছে স্ট্যালিয়ন ক্যাপিটাল লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান সাঈদ ইব্রাহিম আহমেদ বলেন, ‘ভোলা-বরিশাল সেতু শুধু একটি যোগাযোগ অবকাঠামো নয়; এটি দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতি, শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানে দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। জাপানি বিনিয়োগ বাড়ানোর লক্ষ্যেই তারা দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন।’
একই সভায় শরীয়তপুর-চাঁদপুর সেতু প্রকল্পকেও বাংলাদেশ-জাপান যৌথ পিপিপি প্ল্যাটফর্মের নতুন প্রকল্প হিসেবে নিশ্চিত করা হয়েছে। প্রায় ৮ কিলোমিটার দীর্ঘ এ সেতুর ব্যয় ধরা হয়েছে ১৫ হাজার ৯৫৭ কোটি টাকা। এটি নির্মিত হলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলার সঙ্গে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের ১১ জেলার সরাসরি সড়ক যোগাযোগ স্থাপিত হবে। পাশাপাশি খুলনা ও চট্টগ্রামের মধ্যকার সড়কপথ প্রায় ৯০ কিলোমিটার কমে আসবে এবং ঢাকার ওপর যানবাহনের চাপও হ্রাস পাবে।
বৈঠকে ভোলা-লক্ষ্মীপুর সেতু প্রকল্পও উপস্থাপন করা হয়। জাপানি প্রতিনিধি দল প্রকল্পটির প্রতিও আগ্রহ প্রকাশ করেছে। সেতু বিভাগ মনে করছে, মেঘনা নদীর ওপর এ সেতু নির্মিত হলে দক্ষিণাঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থায় আরও বড় পরিবর্তন আসবে এবং আঞ্চলিক বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে।
পিপিপি কর্তৃপক্ষের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আশিক চৌধুরী বলেন, ‘বাংলাদেশ-জাপান যৌথ পিপিপি প্ল্যাটফর্ম বড় অবকাঠামো প্রকল্পে মানসম্মত বিনিয়োগ আকর্ষণের কার্যকর মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বয়ের মাধ্যমে প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি আরও বাড়ানো হবে।’
সভায় প্রধানমন্ত্রীর মুখ্যসচিব এ বি এম আবদুস সাত্তার বলেন, ‘অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে বাংলাদেশ সরকার পূর্ণ সমর্থন দিচ্ছে। যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, আঞ্চলিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে বাংলাদেশ ও জাপান যৌথভাবে কাজ করে যাবে।’