বাকেরগঞ্জে পাঁচ শতাব্দীর ইতিহাস জ্বীনের মসজিদ

রিপোর্টার নাম
  • আপডেট টাইমঃ Monday, August 3, 2026,
  • 57 সংবাদটি পঠিক হয়েছে

বাকেরগঞ্জ প্রতিনিধি :: বাকেরগঞ্জে পাঁচ শতাব্দীর ইতিহাস জ্বীনের মসজিদ

বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার রঙ্গশ্রী ইউনিয়নের রাজাপুর গ্রামের নিভৃত এক প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে সময়ের এক নীরব সাক্ষী, শাহী জামে মসজিদ। প্রায় পাঁচ শতাব্দী ধরে ইতিহাস, ধর্মীয় ঐতিহ্য ও লোককথাকে ধারণ করে টিকে থাকা এই প্রাচীন স্থাপনাটি স্থানীয়দের কাছে শুধু একটি মসজিদ নয়, বরং বিস্ময়, বিশ্বাস ও ঐতিহ্যের প্রতীক।

লোকমুখে এটি ‘জ্বীনের মসজিদ’ কিংবা ‘গায়েবি মসজিদ’ নামেও পরিচিত। স্থানীয়দের একটি অংশের বিশ্বাস, গভীর রাতে এখানে জ্বীনরা এসে ইবাদত করে। যদিও এ বিশ্বাসের কোনো ঐতিহাসিক বা বৈজ্ঞানিক ভিত্তি পাওয়া যায়নি, তবুও প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে প্রচলিত এই লোককাহিনি এখনও মসজিদটিকে ঘিরে মানুষের আগ্রহ বাড়িয়ে চলেছে।

বাকেরগঞ্জ-বরগুনা আঞ্চলিক মহাসড়কের উত্তর পাশে অবস্থিত তিন গম্বুজবিশিষ্ট এই শাহী জামে মসজিদটি মুঘল স্থাপত্যশৈলীর এক অনন্য নিদর্শন। ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, মুঘল শাসনামলে বাংলার সুবাদার শায়েস্তা খানের সময় তাঁর প্রশাসনের সঙ্গে সম্পৃক্ত শেখ শফিউল্লাহ এই মসজিদ নির্মাণ করেন। ইট, পাথর ও সুরকির সমন্বয়ে নির্মিত স্থাপনাটি আজও অতীতের নির্মাণশৈলী ও কারুকার্যের অসাধারণ সাক্ষ্য বহন করে।

স্থানীয় প্রবীণদের বর্ণনা অনুযায়ী, নির্মাণের বহু বছর পর এলাকাটি ঘন জঙ্গলে পরিণত হয়। জনবসতি না থাকায় দীর্ঘদিন মানুষের দৃষ্টির আড়ালে চলে যায় মসজিদটি। চারপাশে ছিল বিস্তীর্ণ বনাঞ্চল, যেখানে বন্য প্রাণীর বিচরণ ছিল স্বাভাবিক ঘটনা।

এরপর আসে ১৮৭৬ সালের ৩১ অক্টোবর। বাংলা ১২৮৩ সালের ১৬ কার্তিক উপকূলজুড়ে আঘাত হানে ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়। সেই দুর্যোগে অসংখ্য গাছপালা উপড়ে গেলে জঙ্গলের ভেতর লুকিয়ে থাকা প্রাচীন মসজিদটি স্থানীয়দের চোখে পড়ে। পরে এলাকাবাসী জঙ্গল পরিষ্কার করে আবারও সেখানে নামাজ আদায় শুরু করেন। সেই থেকে নতুন করে প্রাণ ফিরে পায় শতাব্দীপ্রাচীন এই উপাসনালয়।

মসজিদটিকে ঘিরে রয়েছে নানা রহস্যময় লোককথাও। স্থানীয়দের কেউ কেউ দাবি করেন, গভীর রাতে মসজিদের পাশ দিয়ে গেলে অদ্ভুত শব্দ শোনা যায়। তাদের বিশ্বাস, তখন অদৃশ্য জগতের বাসিন্দারা এখানে ইবাদতে মগ্ন থাকে। এসব বিশ্বাসের সত্যতা নিয়ে কোনো প্রমাণ না থাকলেও লোককাহিনিগুলো আজও মসজিদটির পরিচিতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে রয়েছে।

স্থাপত্যগত দিক থেকেও মসজিদটি অত্যন্ত আকর্ষণীয়। এর ওপর রয়েছে তিনটি দৃষ্টিনন্দন গম্বুজ এবং চার কোণায় চারটি সুউচ্চ মিনার। ভেতরে রয়েছে তিনটি মেহরাব। দেয়ালজুড়ে রয়েছে মুঘল স্থাপত্যের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ খিলান। উত্তর ও দক্ষিণ পাশে বাতাস চলাচলের জন্য রাখা হয়েছে জানালা। সময়ের প্রয়োজনে স্থানীয়দের অর্থায়নে কিছু সংস্কার করা হলেও মূল স্থাপত্যের ঐতিহ্য ও নান্দনিকতা এখনো অনেকটাই অক্ষুণ্ন রয়েছে।

ইসলামের প্রচার ও মুসলিম সমাজের শিক্ষা-সংস্কৃতির বিকাশে একসময় এই মসজিদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল বলে স্থানীয়দের বিশ্বাস। এখনও প্রতি শুক্রবার জুমার নামাজ আদায়ের জন্য দূর-দূরান্ত থেকে শত শত মুসল্লি এখানে সমবেত হন। পাশাপাশি ইতিহাস, প্রত্নতত্ত্ব ও স্থাপত্যপ্রেমীদের কাছেও এটি একটি আকর্ষণীয় গন্তব্য।

স্থানীয়দের দাবি, শত শত বছরের এই ঐতিহ্যবাহী মসজিদকে প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব বিবেচনায় সরকারি সংরক্ষণে নেওয়া উচিত। তাদের মতে, যথাযথ সংরক্ষণ ও গবেষণার মাধ্যমে এটি দেশের গুরুত্বপূর্ণ ইসলামিক ঐতিহ্যবাহী স্থাপনার তালিকায় স্থান করে নিতে পারে এবং ধর্মীয় পর্যটনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।

এ বিষয়ে বাকেরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মিল্টন চন্দ্র পাল বলেন, মসজিদটির ইতিহাস, বর্তমান অবস্থা ও সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে।

শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ইতিহাস, লোকবিশ্বাস ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা রাজাপুর শাহী জামে মসজিদ আজও অতীতের গৌরবের কথা মনে করিয়ে দেয়। যথাযথ সংরক্ষণ ও গবেষণার উদ্যোগ নেওয়া হলে এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য হয়ে উঠতে পারে ইতিহাস ও ঐতিহ্যের এক অমূল্য সম্পদ।

এই পোস্টটি শেয়ার করুন...

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ ...

© All rights reserved © 2021
Developed By Engineerbd.net
EngineerBD-Jowfhowo