শিরোনামঃ
উদ্বোধনের আগেই বরিশালে ক্যানসার হাসপাতালের ৫০ লাখ টাকার পাইপ চুরি ব্যাটারিচালিত রিকশার অবৈধ ব্যবহারে ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব ক্ষতি বরিশালে নদীভাঙনে ভিটেমাটি হারানোর শঙ্কায় হাজারো মানুষ শেয়ালের কামড়ে নারী পুরুষ ও কিশোরসহ আহত ২৭ পটুয়াখালীতে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সকল পদ শূন্য, একই দিনে ২ নবজাতকের মৃত্যু বানারীপাড়ার ওসিসহ ৭ পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে মামলা বরিশালের গৌরব জান্নাতুল প্রীতি, দাবায় টানা ৫বার জাতীয় পর্যায়ে সম্মাননা জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের সামনে ককটেল বিস্ফোরণ প্রতিবন্ধী যুবককে পিটিয়ে হত্যা, ভিডিও ফুটেজ দেখে গ্রেপ্তার ৪ ডিজেল সংকট থাকতে পারে ২০২৭ সাল পর্যন্ত: আইইএ

বরিশালে নদীভাঙনে ভিটেমাটি হারানোর শঙ্কায় হাজারো মানুষ

রিপোর্টার নাম
  • আপডেট টাইমঃ Thursday, October 15, 2026,
  • 5 সংবাদটি পঠিক হয়েছে

নিজস্ব প্রতিবেদক :: বরিশালে নদীভাঙনে ভিটেমাটি হারানোর শঙ্কায় হাজারো মানুষ

বাপ-দাদার ভিটেমাটি বলতে আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। সন্ধ্যা নদীর ভাঙনে গত পাঁচ বছরে পাঁচবার বসতবাড়ি সরাতে হয়েছে বরিশালের বানারীপাড়া উপজেলার ইলুহার গ্রামের বাসিন্দা জয় হাজরার পরিবারকে। প্রতিবারই নতুন করে ঘর বেঁধেছেন, গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছেন সংসার। কিন্তু নদীর ভাঙন থামেনি। এবার যে জায়গায় আশ্রয় নিয়েছেন, সেটিও কত দিন টিকবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছেন তিনি। এ বছর বসতভিটা রক্ষা পেলেও আগামী বছর কী হবে, সেই দুশ্চিন্তা পিছু ছাড়ছে না।

জয় হাজরার মতো এমন অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে বরিশালের নদীতীরবর্তী হাজারো মানুষের। কারও চোখের সামনেই নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে বসতঘর, কারও হারিয়ে যাচ্ছে ফসলি জমি, আবার কারও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও জীবিকার শেষ সম্বলটুকুও তলিয়ে যাচ্ছে নদীতে। বারবার ভাঙনের শিকার হয়ে অনেক পরিবার নিঃস্ব। নতুন করে ঘর বাঁধার জায়গা হারিয়ে কেউ কেউ অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে আছেন।

বরিশালের মেঘনা, কালাবদর, তেঁতুলিয়া, সন্ধ্যা, সুগন্ধা, কীর্তনখোলা, পাণ্ডব ও আড়িয়াল খাঁসহ বিভিন্ন নদ-নদীর অব্যাহত ভাঙনে বদলে যাচ্ছে জনপদের চিত্র। একের পর এক বিলীন হচ্ছে বসতবাড়ি, বাজার, সড়ক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় স্থাপনা ও ফসলি জমি। কোথাও বসতঘর সরিয়ে নেওয়ার আগেই নদীতে তলিয়ে যাচ্ছে ভিটেমাটি, কোথাও আবার গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা চলে এসেছে ভাঙনের একেবারে কিনারে।

মেহেন্দিগঞ্জে ১০ দিনে বিলীন ৮০ বসতঘর

বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলায় নদীভাঙনের পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। মেঘনা, কালাবদর ও তেঁতুলিয়া নদীবেষ্টিত এ উপজেলার চরগোপালপুর ও আলিমাবাদ ইউনিয়নে সাম্প্রতিক সময়ে মাত্র ১০ দিনের ব্যবধানে ৮০টি বসতঘর নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। একই সময়ে বাজারের প্রায় ৪০টি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানও নদীতে বিলীন হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।

এ ছাড়া উপজেলার গোবিন্দপুর, চর মিঠুয়া, দড়িরচর খাজুরিয়া, আদর্শ নগর, আন্দারমানিক, জাঙ্গালিয়া ও দক্ষিণ উলানিয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। বসতভিটা হারানোর পাশাপাশি জীবিকা ও সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগে রয়েছেন নদীতীরবর্তী বাসিন্দারা।

বাবুগঞ্জে হুমকিতে বসতবাড়ি, সড়ক ও স্থাপনা

মেহেন্দিগঞ্জের মতো বাবুগঞ্জ উপজেলাতেও নদীভাঙনে বিপর্যস্ত জনজীবন। সন্ধ্যা, সুগন্ধা ও আড়িয়াল খাঁ নদীর ভাঙনে সড়ক, বেড়িবাঁধ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ, কবরস্থান, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানসহ শতাধিক বসতঘর নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে বলে স্থানীয়ভাবে জানা গেছে।

উপজেলার মীরগঞ্জ ও আশপাশের এলাকায় ভাঙনের কারণে একাধিক গ্রাম হুমকির মুখে পড়েছে। কোথাও কোথাও বসতঘর সরিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজ করছেন বাসিন্দারা। স্থানীয়দের ভাষ্য, বাবুগঞ্জের ক্ষুদ্রকাঠী এলাকায় নদীভাঙন বরিশাল বিমানবন্দরের দক্ষিণ পাশের নিরাপত্তাপ্রাচীরের প্রায় ৬০০ মিটারের কাছাকাছি পৌঁছেছে।

পাঁচ বছরে পাঁচবার ঘর সরিয়েছেন জয় হাজরা

বানারীপাড়া উপজেলার ইলুহার গ্রামের জয় হাজরার জীবনের গল্প নদীভাঙনের নির্মম বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। সন্ধ্যা নদীর ভাঙনে তাঁদের পরিবারের বাপ-দাদার সব সম্পত্তি বিলীন হয়ে গেছে। টিকে থাকার তাগিদে গত পাঁচ বছরে পাঁচবার বসতবাড়ি সরাতে হয়েছে তাঁদের।

জয় হাজরা বলেন, “সন্ধ্যা নদীর ভাঙনে বাপ-দাদার সব সম্পত্তি চলে গেছে। গত পাঁচ বছরে আমাদের পরিবার পাঁচবার বসতবাড়ি সরিয়েছে। যে পরিস্থিতি, তাতে হয়তো এখন যেখানে আছি, সেটি এ বছর টিকে গেলেও আগামী বছর আর টিকবে কি না, জানি না।”

স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, বানারীপাড়ায় নদীভাঙনের তীব্রতা আগের তুলনায় কয়েক গুণ বেড়েছে। বসতভিটা হারানোর পাশাপাশি অনেকের কৃষিজমি ও জীবিকার অবলম্বনও নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে।

বরিশাল সদর উপজেলার চরবাড়িয়া, চরমোনাই ও শায়েস্তাবাদ ইউনিয়নসহ বিভিন্ন এলাকাতেও নদীভাঙন অব্যাহত রয়েছে। গত দেড় দশকে চরবাড়িয়া ইউনিয়নের লামচরী গ্রামের কয়েক শ পরিবার বসতভিটা হারিয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। একসময় যেখানে মানুষের বসতি ছিল, সেই জায়গার অনেক অংশ এখন নদীর পানিতে নিমজ্জিত।

শায়েস্তাবাদ ইউনিয়নের বাসিন্দা করিম হাওলাদার বলেন, “ফসলি জমি ও ভিটেমাটি—সবই নদীর ভাঙনে চলে গেছে। ভাঙন শুরু হলে সহজে থামতে চায় না। আমাদের অবস্থা এখন খুবই খারাপ।”

রাতের আঁধারে হারিয়ে যায় শেষ আশ্রয়

নদীভাঙন কখনো এত দ্রুত ঘটে যে, বাসিন্দারা নিজেদের জিনিসপত্র সরিয়ে নেওয়ারও সুযোগ পান না। বিশেষ করে রাতে ভাঙন শুরু হলে বিপদের মাত্রা আরও বেড়ে যায়। ঘুমন্ত মানুষ কিছু বুঝে ওঠার আগেই হুমকির মুখে পড়ে তাঁদের জীবন ও বসতভিটা।

মুলাদী উপজেলার কৃষক আবুল ফজল নিজের বসতভিটা চোখের সামনে নদীতে বিলীন হতে দেখেছেন। তাঁর অভিজ্ঞতায়, ভাঙনের ভয়াবহতা এতটাই আকস্মিক ছিল যে আগে থেকে প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ পাননি।

আবুল ফজল বলেন, “চোখের সামনে নিজের বসতভিটা ভাঙনে চলে গেছে। ভোররাতে যদি টের না পেতাম, তাহলে হয়তো আমরাও আর বেঁচে ফিরতে পারতাম না। রাতে হঠাৎ এত বেশি ভাঙন শুরু হয়েছিল, কিছু বুঝে উঠতে পারিনি।”

হিজলা উপজেলার স্কুলশিক্ষক জয়নাল মৃধা বলেন, এভাবে ভাঙন চলতে থাকলে একসময় বরিশালের মানচিত্রও বদলে যেতে পারে। প্রতিনিয়ত মানুষ ভিটেমাটি, পরিচিত জনপদ ও দীর্ঘদিনের স্মৃতি হারাচ্ছেন। তাঁর মতে, পানি উন্নয়ন বোর্ডের উচিত ভাঙনপ্রবণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে স্থায়ী প্রতিরক্ষার ব্যবস্থা নেওয়া।

৬০ কিলোমিটার নদীতীরে ভাঙন, তীব্রতা বেশি ২০-২৫ কিলোমিটারে

বরিশাল পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় ৩৮টি নদ-নদী রয়েছে, যেগুলোর মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ৭১৬ কিলোমিটার। এর মধ্যে মেঘনা, তেঁতুলিয়া, কীর্তনখোলা, আড়িয়াল খাঁ, সন্ধ্যা ও সুগন্ধাসহ আটটি নদীর প্রায় ৬০ কিলোমিটার অংশে বর্তমানে ভাঙন চলছে। এর মধ্যে ২০ থেকে ২৫ কিলোমিটার এলাকায় ভাঙনের তীব্রতা বেশি।

নদীভাঙন মোকাবিলায় কয়েকটি এলাকায় জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ফেলে প্রতিরক্ষামূলক কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। তবে নদীতীরবর্তী মানুষের দাবি, বিচ্ছিন্ন ও সাময়িক উদ্যোগের পাশাপাশি ভাঙনপ্রবণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

বরিশাল পানি উন্নয়ন বোর্ডের

এই পোস্টটি শেয়ার করুন...

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ ...

© All rights reserved © 2021
Developed By Engineerbd.net
EngineerBD-Jowfhowo