কক্সবাজারে রিসোর্টে আগুন ঘিরে যত প্রশ্ন

রিপোর্টার নাম
  • আপডেট টাইমঃ Wednesday, October 21, 2026,
  • 16 সংবাদটি পঠিক হয়েছে

নিউজ ডেস্ক :: কক্সবাজারে রিসোর্টে আগুন ঘিরে যত প্রশ্ন

কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভ সংলগ্ন একটি রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১০ জনের মৃত্যু ও এক নারী পর্যটক নিখোঁজের ঘটনা ঘিরে গভীর রহস্য সৃষ্টি হয়েছে। অগ্নিকাণ্ডের সময় রিসোর্টের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নিজেদের পোষা কুকুর ও বিড়াল নিয়ে নিরাপদে সরে গেলেও ভেতরে থাকা পর্যটকদের কেন সতর্ক বা উদ্ধারের চেষ্টা করলেন না; প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট তদন্ত কমিটির সামনে এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে সেটিই।

এর আগে শনিবার (১৭ অক্টোবর) সকাল ৭টার দিকে উখিয়ার মেরিন ড্রাইভসংলগ্ন পাটোয়ারটেক এলাকার ‘টুপটুপ রেস্তো অ্যান্ড রিসোর্ট’-এ বিকট বিস্ফোরণের পর এই অগ্নিকাণ্ড ঘটে।

খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের তিনটি ইউনিট সকাল ৮টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণ ও উদ্ধারকাজ শুরু করে এবং সকাল ১০টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। উদ্ধার তৎপরতায় ফায়ার সার্ভিসকে সহায়তা করেন বিজিবি, পুলিশ ও কোস্টগার্ডের সদস্যরা। ওই রিসোর্ট থেকে একে একে ১০ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এছাড়া আগুনে আহত সাতজনকে হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হয়েছে।

উদ্ধার হওয়া ১০ জনের মরদেহ বর্তমানে কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে। মৃতদের পরিচয় নিশ্চিত করতে স্বজনদের পাশাপাশি মরদেহগুলো থেকে ডিএনএ পরীক্ষার নমুনা সংগ্রহ করে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনায় ইতোমধ্যে মামলা হয়েছে এবং গঠন করা হয়েছে প্রশাসনিক তদন্ত কমিটি।

 

কুকুর-বিড়াল নিয়ে কর্মীদের পলায়ন

প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, রিসোর্টটিতে বিকট শব্দে বিস্ফোরণের পরই আগুনের সূত্রপাত হয়। আগুন লাগার পরপরই সেখানে অবস্থানরত কয়েকজন পর্যটক হুড়োহুড়ি করে বের হয়ে আসেন। এর ঠিক পরপরই রিসোর্টের অন্তত পাঁচজন কর্মীকে দুটো কুকুর ও চারটি বিড়াল সঙ্গে নিয়ে বের হয়ে দ্রুত পালিয়ে যেতে দেখেন স্থানীয়রা।

জানা গেছে, রিসোর্টটির মালিক তানভীর আহমদ ও নিয়াজ মোরশেদ নামের দুই ব্যক্তি। এর মধ্যে মালিক তানভীরের পোষা দুটো কুকুর ও চারটি বিড়াল রিসোর্টের দ্বিতীয় তলায় তার নিজস্ব কক্ষে রাখা হতো। আগুন লাগার পর কর্মচারীরা দ্রুত দোতলায় গিয়ে প্রাণীগুলোকে উদ্ধার করে নিয়ে নিরাপদে সটকে পড়েন।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, কর্মচারীদের প্রাণীগুলো নিয়ে নিরাপদে বের হতে দেখা গেলেও কক্ষে আটকে পড়া পর্যটকদের সজাগ করা কিংবা উদ্ধারের কোনো উদ্যোগ তাদের ছিল না। ফলে দ্রুতই আগুনের তীব্রতা বাড়লে ভেতরে থাকা ১০ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটে।

ঘটনাস্থলের এক স্থানীয় যুবক জানান, রিসোর্টের মালিককে প্রায়ই এসব পোষা প্রাণী সঙ্গে নিয়ে ঘুরে বেড়াতে দেখা যেত। অগ্নিকাণ্ডের পর কর্মচারীরা প্রাণীগুলো রক্ষায় যতটা তৎপর ছিলেন, ভেতরে আটকে পড়া পর্যটকদের বাঁচাতে তাদের কোনো ভূমিকাই দেখা যায়নি। আগুনের তীব্রতা বাড়লে কয়েকজন ওপর থেকে লাফিয়ে পড়ে বাঁচলেও অন্যরা ভেতরেই আটকা পড়েন।

এদিকে এ ঘটনায় কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) তাসনীম জাহানকে প্রধান করে সাত সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি রোববার (১৮ অক্টোবর) ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে প্রত্যক্ষদর্শী, স্থানীয় বাসিন্দা, রিসোর্টে অবস্থানকারী জীবিত ও আহত ব্যক্তি এবং মৃতদের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলেছে।

তদন্ত কমিটির এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, আগুনের সূত্রপাত এবং রিসোর্টের কর্মীদের সবাইকে নিরাপদে বের হয়ে যাওয়ার বিষয়টি তদন্ত কমিটির নজরে এসেছে। এসব তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।

তদন্ত কমিটির প্রধান এডিএম তাসনীম জাহান জানান, অনেক প্রত্যক্ষদর্শী ঘটনার বিবরণ দিয়েছেন। প্রতিষ্ঠানটির কী ধরনের অনিয়ম ছিল এবং ওই সময় কর্মীদের কী গাফিলতি ছিল, সে সংক্রান্ত তথ্য পাওয়া গেছে। এসব বিষয় চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদনে বিস্তারিত উল্লেখ করা হবে।

 

১০ মরদেহ শনাক্ত হলেও নিখোঁজ শিক্ষিকা

অন্যদিকে অগ্নিকাণ্ডের পর স্বজনদের দেয়া তথ্য অনুযায়ী রিসোর্টে অবস্থানকারী পর্যটকদের মধ্যে নিখোঁজের তালিকায় ছিলেন মোট ১১ জন। উদ্ধার তৎপরতায় অংশ নেয়া কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের উপসহকারী পরিচালক সৈয়দ মোরশেদ হোসেন জানান, অভিযানের শুরুতে দুটো কক্ষ থেকে ছয়জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে সন্ধ্যার দিকে অন্য একটি কক্ষ থেকে দুই শিশুসহ আরও চারজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

ফায়ার সার্ভিস ও স্বজনদের তথ্যের ভিত্তিতে প্রাথমিকভাবে প্রশাসন নিশ্চিত হয়েছে যে প্রথমে উদ্ধার হওয়া ছয়জনের মরদেহ একই সঙ্গে ভ্রমণে আসা নিকটাত্মীয়দের। তারা হলেন ঢাকার বনশ্রীর বাসিন্দা মো. আশিকুল ইসলামের স্ত্রী ইসরাত জাহান মালিহা (৩০), ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির মেলিতা মেহেজাবিন আলভী (২৩), জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের লায়লা জাহান নাবিলা (২৭), নাফিসতা মীম (২৭), নাফিজের বড় বোন ফারিয়া কবির (৩৩) এবং তাঁর পাঁচ বছর বয়সি ভাগনে ফায়িজান আহম্মেদ।

পরবর্তী সময়ে উদ্ধার হওয়া দুই শিশুসহ চারজনের মরদেহ শনাক্ত হয়েছে যশোরের নাহিদুর রহমান (৪১), তার স্ত্রী আফসানা মতিন তানজি (৩৬) এবং তাদের দুই সন্তান রুজাইনা ইনায়া (৭) ও সুনাইনা ইহানা (৩) হিসেবে। ডিএনএ পরীক্ষার প্রতিবেদন পাওয়ার পর এ বিষয়ে শতভাগ নিশ্চিত হওয়া যাবে।

উদ্ধার হওয়া ১০ জনের পরিচয় শনাক্ত হওয়ায় তালিকার বাকি একজন অর্থাৎ ঢাকার সাভারের ‘স্বপ্ন বিলাস স্কুল’ নামের একটি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষিকা নাসরিন আক্তার মুক্তা (২৯) নিখোঁজ রয়েছেন বলে নিশ্চিত হয়েছে প্রশাসন। নাসরিন আক্তার ঢাকা জেলা ছাত্রদলের সহ-সভাপতি বাদল হোসেনের স্ত্রী। তার অবস্থান শনাক্ত করতে প্রযুক্তিগত অনুসন্ধান চালানো হচ্ছে।

এ বিষয়ে তদন্ত কমিটির প্রধান এডিএম তাসনীম জাহান জানান, নিখোঁজ নারী অগ্নিকাণ্ডের সময় রিসোর্টের ভেতরে আটকা পড়েছিলেন নাকি বাইরে ছিলেন, তা নিশ্চিত হতে পুলিশের বিশেষ শাখা (এসবি) ও তদন্তকারী দল কাজ করছে। নিখোঁজের মোবাইল ফোন নম্বরের নেটওয়ার্ক লোকেশন ও কল ডেটাসহ অন্যান্য তথ্য বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।

নিখোঁজ মুক্তার স্বামী বাদল হোসেন জানান, অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত রিসোর্টটিতে ফয়সালের স্ত্রীসহ তিন বান্ধবী বেড়াতে গিয়ে উঠেছিলেন। সকালে দুই বান্ধবী কক্ষ থেকে কিছুটা আগেই বাইরে বের হয়ে আসেন। তবে তার স্ত্রী নাসরিন আক্তার কক্ষের ভেতরেই অবস্থান করছিলেন। আগুন লাগার পর তিনি ভেতরে আটকা পড়েন বলে ধারণা করা হচ্ছে। এরপর থেকে তার আর কোনো খোঁজ মেলেনি।

 

ম্যানেজার গ্রেফতার, তদন্তে পুলিশ

ঘটনার সার্বিক বিষয়ে উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান মজুমদার জানান, রিসোর্টের মালিকসহ চারজনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা আরও ১৯ জনকে আসামি করে থানায় মামলা করা হয়েছে। এ মামলার এজাহারভুক্ত আসামি রিসোর্টের ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ সুমনকে ইতোমধ্যে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

ওসি জানান, তদন্তের স্বার্থে সুমনের সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে আদালতে আবেদন করা হয়েছে। রিমান্ড মঞ্জুর হলে তাকে বিস্তারিত জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। একই সঙ্গে মামলার অন্য আসামিদের গ্রেফতারে পুলিশের অভিযান চলছে।

নিখোঁজ শিক্ষিকার বিষয়ে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বলেন, নিখোঁজের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। ফায়ার সার্ভিসের সহায়তায় রিসোর্টটিতে কয়েক দফা তল্লাশি চালানো হলেও কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। ফলে প্রযুক্তির সহায়তা নেয়া হচ্ছে। তিনি আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছেন নাকি জীবিত অবস্থায় অন্য কোথাও আছেন, তা এখনও নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। পুলিশ অনুসন্ধান অব্যাহত রেখেছে, সুনির্দিষ্ট তথ্য পেলে তা জানানো হবে।

এই পোস্টটি শেয়ার করুন...

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ ...

© All rights reserved © 2021
Developed By Engineerbd.net
EngineerBD-Jowfhowo