আ’লীগহীন মাঠেও কণ্টকমুক্ত নয় বিএনপি : বরিশালের ৬টি আসনে কঠিন সমীকরণ
নিজস্ব প্রতিবেদক :: বরিশাল জেলায় সংসদীয় আসন ছয়টি। এর মধ্যে মহানগর ও সদর উপজেলা নিয়ে গঠিত বরিশাল-৫ আসনটি পরিচিত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ঘাঁটি হিসেবে। বাকি পাঁচ আসন অতীতের সংসদ নির্বাচনগুলোতে হাতবদল হয়েছে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টির (জাপা) নেতাদের মধ্যে। কোনো নির্বাচনেই জামায়াতে ইসলামী বা ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থীরা ন্যূনতম প্রতিদ্বন্দ্বিতাও গড়তে পারেননি।
১৯৯১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত গ্রহণযোগ্য চারটি নির্বাচনের ফলাফল ঘেঁটে এমন পরিসংখ্যান মিলেছে। ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে নেই আওয়ামী লীগ। জাপা থাকলেও শক্তিহীন। এই ছয়টি আসনের একটিও বিএনপির জন্য কণ্টকমুক্ত নয়। বরিশাল-১ আসনে দলটির প্রার্থীকে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ফেলতে পারেন স্বতন্ত্র প্রার্থী (বিদ্রোহী)। অন্য পাঁচ আসনের জয়-পরাজয়ও নানা সমীকরণের ওপর নির্ভর করছে।
বরিশাল-১ (গৌরনদী-আগৈলঝাড়া)
২০০১ সালের নির্বাচনে এখানে জয়ী হয়েছিলেন বিএনপির জহির উদ্দিন স্বপন। এবারও দলের কেন্দ্রীয় এই উপদেষ্টাকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। তাঁর জন্য নির্বাচন কঠিন হয়ে উঠতে পারে, ২০০১ সালের নির্বাচনের পর দেশজুড়ে আলোচিত হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর নির্যাতনের ঘটনা সামনে আসায়। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরাও এটি সামনে রাখছেন। স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ায় বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত প্রকৌশলী আব্দুস সোবাহান সরাসরিই বলছেন, ‘হিন্দুদের রক্ষার জন্য প্রার্থী হয়েছি। হিন্দুরা অতীতের মতো অত্যাচারিত হয়ে রামশীল যেতে চান না।’
এ আসনে ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০৮ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়েছিলেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে এখানে মোট ভোটার ৩ লাখ ২৮ হাজার ১১৯ জন। তাদের মধ্যে ১ লাখ ৮৬ হাজার ৬১৪ ভোটার গৌরনদীর ও ১ লাখ ৪১ হাজার ৫০৫ জন আগৈলঝাড়ার বাসিন্দা। তথ্যমতে, এ আসনের মোট ভোটারের ৪০ শতাংশ হিন্দু ধর্মাবলম্বী। আগৈলঝাড়া উপজেলায় যা প্রায় ৬০ শতাংশ। আব্দুস সোবাহানের বাড়িও এ উপজেলায়। এ ছাড়া ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী মো. রাসেল সরদারের বাড়িও এখানে। জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মো. কামরুল ইসলাম খানের বাড়ি গৌরনদীতে।
বিএনপি থেকে এখানে মনোনয়ন চেয়েছিলেন কেন্দ্রীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক আকন কুদ্দুসুর রহমান ও সদস্য কামরুল ইসলাম সজল। তারা মনোনয়ন না পাওয়ায় মনোক্ষুণ্ন। স্বপনের প্রচারণায়ও তাদের দেখা যাচ্ছে না। এ ছাড়া প্রায় প্রতিদিনই আব্দুস সোবাহানের সমর্থকদের ওপর হামলার অভিযোগ উঠছে। এ আসনে সৃষ্ট পরিস্থিতির জন্য প্রার্থী জহির উদ্দিন স্বপনকেই দায়ী করেন আকন কুদ্দুসুর রহমান। তাঁর ভাষ্য, ‘মনোনয়ন পেয়ে স্বপন এ পর্যন্ত আমি, ইঞ্জিনিয়ার সোবাহানসহ কারও সঙ্গে যোগাযোগ করেননি। এমনকি আমার অনুসারী কাউকে নির্বাচনী কমিটিতেও রাখেননি। তারপরও দলের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে আমি গৌরনদীতে পথসভা করে সবাইকে ধানের শীষের পক্ষে থাকার জন্য বলব।’
জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, ‘দলে পদ অনুযায়ী নির্বাচনী দায়িত্ব বণ্টন করা হয়েছে। মনোনয়ন পাওয়ার পর একসঙ্গে কাজ করার জন্য বঞ্চিত অন্য নেতাদের সঙ্গে কথা বলেছি। ইঞ্জিনিয়ার সোবাহানের বাড়িতে গিয়েছি, তারপরও তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন। এখনও যারা দলের সিদ্ধান্ত মানছেন না, নির্বাচনের পর এসব বিষয়ে দলীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
বরিশাল-২ (বানারীপাড়া-উজিরপুর)
এবার বিএনপি মনোনয়ন দিয়েছে সরদার সরফুদ্দিন আহমেদ সান্টুকে। ২০০৮ সালের নির্বাচনে তিনি হেরেছিলেন আওয়ামী লীগের কাছে। ২০১৮ সালের ভোটের আগেই হামলা-মামলায় এলাকা ছাড়েন। এবার আওয়ামী লীগহীন মাঠে সান্টুর জয়ের হিসাব জটিল করেছে দলেরই একাংশ। বানারীপাড়া উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি গোলাম মাহবুব ও পৌর কৃষক দলের আবদুল গাফফার হোসেনসহ কয়েকশ নেতাকর্মী সম্প্রতি জামায়াতে যোগ দেন। তারা ওই দলের আবদুল মন্নানের দাঁড়িপাল্লায় জন্য মাঠে নেমেছেন।
সাবেক সাধারণ সম্পাদক গোলাম মাহবুব দীর্ঘদিন বিএনপিতে সান্টুবিরোধী গ্রুপের নেতৃত্বে ছিলেন। ৪৫ বছর পর দল ছাড়ার জন্য তিনি দলীয় বঞ্চনা ও সান্টুর দাম্ভিকতাকে দায়ী করেন। এখানে মনোনয়ন পাননি কেন্দ্রীয় সহ বন ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক কাজী রওনাকুল ইসলাম টিপু ও সাবেক ছাত্রদল নেতা দুলাল হোসেন। তারা দলীয় প্রার্থীর পক্ষে মাঠে নেই। এ প্রসঙ্গে কাজী টিপু বলেন, ‘প্রার্থী ডাকেননি, তাই প্রচারে নামা হয়নি। জুনিয়রদের সঙ্গে প্রচারে নামা আমার শোভা পায় না। জুনিয়রদের দিয়ে ধানের শীষের পক্ষে কাজ করাচ্ছি। আমি মনিটর করছি।’
এ আসনের ভোটার তিন লাখ ৮৫ হজার ৮০৭ জন, উজিরপুরেই যা ২ লাখ ৩৬ হাজার ২১৫ জন। এ আসনের আট প্রার্থীর মধ্যে সক্রিয় চারজন। বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থী ছাড়া অন্যরা হলেন–বাংলাদেশ জাসদের আবুল কালাম আজাদ ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. নেছার উদ্দিন। আবুল কালাম আজাদ উজিরপুর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান। একই উপজেলায় বাড়ি নেছার উদ্দিনের।
উজিরপুরের ৩টি বিল ইউনিয়নের ৮০ শতাংশ ভোটার হিন্দু সম্প্রদায়ের। স্থানীয় পর্যবেক্ষকেরা মনে করছেন, এই তিন ইউনিয়নের পাশাপাশি বানারীপাড়ার ১ লাখ ৪৯ হাজার ৫৯২ ভোটারের হাতেই নির্ধারিত হবে প্রার্থীর ভাগ্য।
বক্তব্য জানতে সরদার সরফুদ্দিন আহমেদ সান্টুকে দফায় দফায় কল দিলেও ধরেননি। তাঁর নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান এসএম আলাউদ্দিন বলেন, ‘সাবেক ছাত্রদল নেতা দুলালসহ অনেক কেন্দ্রীয় নেতা সান্টুর সঙ্গে প্রচারে নেমেছেন। কাজী টিপু কেন প্রচারে নামেননি, তা জানা নেই।’
বরিশাল-৩ (মুলাদী-বাবুগঞ্জ)
২০০৮ সালে এখানে মহাজোটের প্রার্থী জাপা নেতা গোলাম কিবরিয়া টিপুর কাছে ৬ হাজার ৪১২ ভোটে হেরে যান বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য বেগম সেলিমা রহমান। দলটির বিদ্রোহী নেতা জয়নুল আবেদীন পান ২০ হাজার ৪৮ ভোট। সেলিমা ও জয়নুলের মোট ভোট ছিল ৮০ হ