হজরত ইউসুফের (আ.) এর অলৌকিক পথচলা

রিপোর্টার নাম
  • আপডেট টাইমঃ Saturday, August 22, 2026,
  • 7 সংবাদটি পঠিক হয়েছে

ধর্ম ডেস্ক :: হজরত ইউসুফের (আ.) এর অলৌকিক পথচলা

হজরত ইউসুফ (আ.) মিশরে পৌঁছেছিলেন দাস-ব্যবসায়ীদের সঙ্গে একজন দাস হিসেবে। মিশরের আজিজ তাকে কিনে নিয়েছিলেন। কিন্তু আল্লাহ তাআলার ইচ্ছায় তিনিই এক সময় মিশরের আজিজ হন। তিনিই বনি ইসরাইল তথা ইয়াকুবের (আ.) পরিবারকে মিশরে নিয়ে আসেন। মিশরের মানুষ বনি ইসরাইলকে তাদের আজিজের পরিবার হিসেবে অত্যন্ত সম্মানের সঙ্গে গ্রহণ করে। ইউসুফের (আ.) শাসনকালে স্বাভাবিকভাবেই বনি ইসরাইল মিশরে অত্যন্ত সম্মানিত ও প্রভাবশালী ছিল। ইউসুফের (আ.) মৃত্যুর পরও দীর্ঘকাল নীলনদের তীরবর্তী এই ভূখণ্ডে বনি ইসরাইল শান্তিতে সম্মানের সঙ্গে বসবাস করেছে। ইউসুফের (আ.) ও তার সময়ের ফেরাউনের ইন্তেকালের পর আরও বেশ কয়েকজন ফেরাউনও বনি ইসরাইলের সঙ্গে ন্যায় ও ভালো আচরণ করেছে।

বনি ইসরাইলের ওপর নির্যতন শুরু হয় মুসার (আ.) সময়কালীন ফেরাউন মিশরের সিংহাসনে বসার পর। এই ফেরাউনের প্রকৃত নাম নিয়ে মতভেদ রয়েছে। অনেকের মতে এই ফেরাউনের নাম ছিল ‘রামেসিস’, অনেকে বলেন, তার নাম ছিল ‘মারনেপতাহ’। অনেকে আবার বলেছেন তার নাম ছিল ‘ওয়ালিদ ইবনে মাসআব ইবনে রাইয়ান’ যে প্রায় তিনশত বছর হায়াত পায় এবং কালক্রমে অত্যন্ত নিষ্ঠুর, অত্যাচারী ও স্বৈরাচারী হয়ে ওঠে।

আল্লামা ইবনে কাসিরের (রহ.) বর্ণনা অনুযায়ী, প্রায় তিনশ বছর জীবিত থাকা এই ফেরাউনই মিশরের রাষ্ট্রব্যবস্থাকে কলুষিত করে বরং বনি ইসরাইলকে চরম লাঞ্ছনা ও দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ করে।

ফুটপাতের আতর বিক্রেতা থেকে মিশরের মসনদে
কথিত আছে, রাজত্ব পাওয়ার পূর্বে ফেরাউন মূলত পারস্যের ইসফাহান শহরের এক নিঃস্ব ও দেনাগ্রস্ত আতর বিক্রেতা ছিল। ঋণের দায়ে জর্জরিত হয়ে সে একসময় ভাগ্যান্বেষণে মিশরে এসে পৌঁছায়।

মিশর শহরের প্রবেশদ্বারে এসে সে দেখতে পায়, দরজায় এক দিরহামে এক ঝুড়ি তরমুজ বিক্রি হচ্ছে, অথচ শহরের ভেতরে একটি তরমুজের দামই এক দিরহাম! মুনাফার আশায় সে এক ঝুড়ি তরমুজ কিনে শহরের ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করে। কিন্তু পাহারাদার ও প্রশাসনিক নৈরাজ্যের কারণে একটি ছাড়া বাকি সব তরমুজই তার কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া হয়। ক্ষোভ ও বিষাদ থেকে সে খোঁজ নিয়ে জানতে পারে মিশরের তত্কালীন রাজা বিলাসিতায় মত্ত, রাজ্যের কোনো খবরাখবর তিনি রাখেন না; আর উজিরদের চরম স্বেচ্ছাচারিতায় রাজ্যজুড়ে চলছে অনিয়ম।

পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে এই চতুর ব্যক্তি গোরস্থানের পাশে এক টুকরো কাপড় বিছিয়ে বসে এবং প্রতিটি লাশ দাফনের বিনিময়ে চার দিরহাম করে কর আদায় শুরু করে। এক দিন স্বয়ং রাজার কন্যার ইন্তেকাল হলে, রাজকীয় শবযাত্রাও সে আটকে দেয় এবং দ্বিগুণ কর অর্থাৎ আট দিরহাম দাবি করে বসে!

বিষয়টি রাজার গোচরীভূত হলে রাজকীয় দরবারে তাকে তলব করা হয়। রাজার প্রশ্নের জবাবে সে উত্তর দেয়, আপনার রাজ্যে কোনো বিচার বা প্রশাসনিক তদারকি নেই। রাজত্ব যে ধ্বংসের মুখে, তা আপনাকে অনুধাবন করাতেই আমি এই পথ বেছে নিয়েছিলাম। তার এই চাতুর্যপূর্ণ উত্তরে সন্তুষ্ট হয়ে রাজা তৎকালীন উজিরকে বরখাস্ত করে তাকেই নতুন উজির পদে নিয়োগ দেন। পরবর্তীকালে রাজার মৃত্যুর পর মিশরের শাসনভার এই উজিরের হাতে চলে যায়। শাসনকালের শুরুর দিকে সে সুশাসনের ভান করলেও সুদীর্ঘকাল ক্ষমতায় থাকার কারণে অহংকারে মত্ত হয়ে এক সময় সে নিজেকে ‘রব’ বা উপাস্য বলে দাবি করে বসে। (আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া)

বনি ইসরাইলের ওপর নিষ্ঠুর নির্যাতন
ক্ষমতায় চেপে বসা এই ফেরাউন বনি ইসরাইলকে সমাজের সর্বনিম্ন ও ঘৃণ্য কাজের জন্য দাস হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা সেই নির্মম অবস্থার চিত্র তুলে ধরেছেন, নিশ্চয়ই ফেরাউন দেশে স্বৈরাচারী হয়েছিল এবং সেখানকার অধিবাসীদের বিভিন্ন দলে বিভক্ত করেছিল। তাদের একটি দলকে সে চরম দুর্বল করে রেখেছিল। (সুরা কাসাস: ৪)

এই নিপীড়ন আরও ভয়াবহ রূপ নেয় মুসার (আ.) জন্মের ভবিষ্যদ্বাণীর কারণে।

বনি ইসরাইলের মধ্যে তখন একটি সুসংবাদ প্রচলিত ছিল যে, ইবরাহিমী বংশধারায় এমন এক সন্তানের আগমন ঘটবে, যার হাতে মিশরের রাজত্ব ও ফেরাউনের দম্ভ চূর্ণ-বিচূর্ণ হবে। এই ভবিষ্যদ্বাণী যে কোনোভাবে ফেরাউনের কান অব্দি পৌঁছায়।

অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, ফেরাউন এক রাতে এক ভয়াবহ স্বপ্ন দেখে। সে দেখে বাইতুল মুকাদ্দাস থেকে ধেয়ে আসা এক বিকট আগুনের শিখা পুরো মিশরকে গ্রাস করে ফেলছে। সেই আগুন মিশরের মূল অধিবাসী কিবতি জাতি ও রাজপ্রাসাদকে ভস্মীভূত করে দিচ্ছে, অথচ বনি ইসরাইলের বিন্দুমাত্র ক্ষতি করছে না

তটস্থ হয়ে ঘুম ভাঙার পর ফেরাউন রাজ্যের সমস্ত গণক, জাদুকর ও জ্যোতিষীদের তলব করে। তারা ফেরাউনকে জানায়, এই স্বপ্নের ব্যাখ্যা হলো, বনি ইসরাইলে এমন এক পুত্রসন্তান জন্মগ্রহণ করবে, যার হাতেই তার রাজত্বের পতন ঘটবে।

শুরু হলো শিশুহত্যার তাণ্ডব
স্বপ্নের ব্যাখ্যা শুনে ভীতসন্ত্রস্ত ফেরাউন অবিলম্বে আদেশ জারি করে, বনি ইসরাইলের ঘরে জন্ম নেওয়া প্রতিটি নবজাতক পুত্রসন্তানকে সঙ্গে সঙ্গে হত্যা করতে হবে।

শুরু হয় এক বিভীষিকাময় তাণ্ডব। ধাত্রী ও গুপ্তচরদের নিয়োজিত করা হয় বনি ইসরাইলের মায়েদের শিশু জন্মদানের খবর ফেরাউনের বাহিনির কাছে পৌঁছানোর জন্য। কোনো শিশু জন্ম নিলেই তাদের কাছে খবর চলে যেত, তারা শিশুটিকে মায়ের কোল থেকে ছিনিয়ে নিয়ে হত্যা করতো। বনি ইসরাইলের অজস্র শিশুকে এভাবে হত্যা করা হয়।

কিন্তু আল্লাহর তাআলা যা ফয়সালা করেছেন তা ঠেকানোর ক্ষমতা ফেরাউনের ছিল না। যে শিশুর বড় হওয়া ঠেকাতে ফেরাউন হাজার হাজার নিরীহ শিশুর রক্তে হাত রাঙিয়েছিল, সেই শিশু বড় হয়েছিলেন ফেরাউনেরেই রাজপ্রাসাদে, তার স্ত্রীর কোলে তার দেওয়া খাদ্যেই তিনি বেড়ে উঠেছিলেন! শেষ পর্যন্ত তার হাতেই জালিম ফেরাউন ও তার জুলুমের সাম্রাজ্য ধ্বংস হয়ে যায়।

আল্লাহ তাআলা বলেন, আমি চাইলাম সেই দেশে যাদেরকে দুর্বল করে রাখা হয়েছিল তাদের প্রতি অনুগ্রহ করতে, তাদেরকে নেতৃত্ব দান করতে আর তাদেরকে দেশের উত্তরাধিকারী বানাতে। (সুরা কাসাস: ৫)

সূত্র:

সুরা কাসাস, আয়াত ৪-৬
সুরা শুয়ারা, আয়াত ৫৭-৫৯
তাফসিরে ইবনে কাসির (সুরা আল-কাসাস: ১-৬, সুরা আল-আরাফ: ১৩৩-১৩৭)
আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া

এই পোস্টটি শেয়ার করুন...

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ ...

© All rights reserved © 2021
Developed By Engineerbd.net
EngineerBD-Jowfhowo