ইসলামী জীবন
রমজান মাসের ফজিলত
রমজান মাস সমাগত যা ইবাদতের সুবর্ণ সুযোগ। এ মাসে আল্লাহ তাআলা মুমিন বান্দাদের নেক আমলের সওয়াব সীমাহীন ভাবে বৃদ্ধি করে থাকেন এবং প্রদান করেন অফুরন্ত কল্যাণ ও বরকত। এ মাস কোরআন নাজিলের মাস। রাত্রি জেগে ইবাদত ও বন্দেগী করার মাস। তারাবির নামাজে কোরআনুল কারীম তেলাওয়াতের মাস। দিনের বেলায় সিয়াম পালনের মাস। ধৈর্য, সহনশীলতা ও আত্মশুদ্ধির মাস।দান ও সদকার মাস। মানুষের প্রতি দয়া করার মাস। আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের পক্ষ থেকে পুরস্কার প্রাপ্তি ও প্রতিদানের মাস। জান্নাত প্রাপ্তি ও জাহান্নাম থেকে মুক্তির মাস।
আল্লাহ তাআলা বলেন, রমজান সেই মাস যে মাসে কুরআন নাযিল করা হয়েছে, যা বিশ্ব মানবের জন্য হেদায়াত এবং সুস্পষ্ট পথ নির্দেশ আর হক ও বাতিলের মধ্যে পার্থক্যকারী। (সূরা বাকারা-১৮৫ নং আয়াত )। এ মহিমান্বিত মাস রহমত, বরকত এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তির। প্রথম দশদিন রহমতের, দ্বিতীয় দশদিন মাগফিরাতের এবং শেষ দশ দিন জাহান্নাম থেকে মুক্তির।
সহি বুখারী ও মুসলিম শরীফে হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, যখন রমজান মাস আগমন করে, তখন জান্নাতের দরজা সমূহ খুলে দেয়া হয়, জাহান্নামের দরজার সমূহ বন্ধ করে দেয়া হয় এবং শয়তানকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করে রাখা হয়। ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহমাতুল্লাহি আলাইহি হযরত আবু হোরায়রা রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আমার উম্মতকে মাহে রমাদানে পাঁচটি বৈশিষ্ট্য দেয়া হয়েছে, যা পূর্ববর্তী কোন উম্মতকে দেয়া হয়নি।
এক, রোজাদারের মুখের দুর্গন্ধ আল্লাহ তায়ালার কাছে মেশকের সুঘ্রাণ থেকেও অতি উত্তম। দুই, রোজাদারের জন্য ফেরেশতারা ইফতারের পূর্ব পর্যন্ত আল্লাহ তাআলার কাছে মাগফিরাতের দোয়া করতে থাকেন। তিন, রোজাদারের জন্য আল্লাহ তায়ালা প্রতিদিন জান্নাতকে সুসজ্জিত করে বলেন, আমার নেককার বান্দাগণ অনেক কষ্ট স্বীকার করে খুব তাড়াতাড়ি তোমাদের সান্নিধ্যে আসছে। চার, এ মহিমান্বিত মাসে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন শয়তানদেরকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করেন, ফলে তারা অন্য মাসের ন্যায় এ মাসে বান্দাকে গোমরাহীর পথে নিতে পারে না। পাঁচ, রমজানের শেষ রজনীতে রোজাদারকে মাফ করে দেয়া হয়, আরজ করা হয়, হে রাসুল, এ ক্ষমা কি কদরের রাতে করা হয়? উত্তরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, না বরং কোন শ্রমিককে তার প্রতিদান তখনই দেয়া হয়, যখন শ্রমিক তার কাজ সমাপ্ত করে।
সিয়াম পালনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল তাকওয়া অর্জন করা। আল্লাহ তায়ালা বলেন, হে ঈমানদারগণ, তোমাদের উপর সিয়াম ফরজ করা হয়েছে, যেমনিভাবে তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর ফরজ করা হয়েছিল,যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো। (সূরা বাকারা-১৮৩)। সিয়াম সাধনায় পাপ মোচন হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যে ব্যক্তি বিশ্বাসের সাথে এবং সওয়াবের নিয়তে রামাদানের সিয়াম পালন করবে ,তার অতীতের গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে। (বুখারী ও মুসলিম)।
সিয়াম পালনকারী কে সীমাহীন প্রতিদান প্রদান করা হবে। হাদিস শরীফে এসেছে, হযরত আবু হোরায়রা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, সিয়াম ছাড়া আদম সন্তানের সব আমল তার নিজের জন্য, আর সিয়াম তা একমাত্র আমার জন্য, আমি নিজেই এর প্রতিদান দিব। আর সিয়াম ঢাল স্বরূপ অতঃপর যদি তোমাদের কেউ সিয়াম পালন করে, তাহলে সে যেন অশ্লীল কথা না বলে। যদি কেউ তাকে গালি দেয় অথবা তার সাথে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়, তবে সে যেন বলে আমি রোজাদার। (বুখারী ও মুসলিম)।
সিয়াম পালনকারীর জন্য দুটি খুশি রয়েছে। প্রথমটি ইফতারের সময় আর দ্বিতীয়টি মহান রবের সাথে দীদারের সময়। ইফতারের সময় খুশি হচ্ছে, মহান রব তাকে সিয়ামের মত একটি উত্তম এবাদত করার সুযোগ দিয়েছেন এবং তার জন্য পানাহার ও স্ত্রী মিলন হালাল করেছেন, যা সিয়াম অবস্থায় নিষিদ্ধ ছিল। আর মহান রবের সাথে সাক্ষাতের খুশি হচ্ছে, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাকে যেদিন পরিপূর্ণ প্রতিদান দিবেন, এবং আল্লাহ বলবেন, সিয়াম পালনকারীরা কোথায়? তোমরা রাইয়ান নামক দরজা দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করো, যে দরজা দিয়ে সিয়াম পালনকারী ছাড়া অন্য কেউ প্রবেশ করতে পারবে না।
সিয়ামের আরেকটি অন্যতম ফজিলত হল, সিয়াম পালনকারীর জন্য সিয়াম নিজেই আল্লাহর দরবারে সুপারিশ পেশ করবেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, সিয়াম ও কোরআন বান্দার জন্য আল্লাহর দরবারে সুপারিশ পেশ করবে, সিয়াম বলবে, হে আল্লাহ! আমি তাকে পানাহার ও যৌনাচার হতে বিরত রেখেছি। সুতরাং তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ কবুল করুন। কোরআন বলবে, হে আল্লাহ! আমি রাতের ঘুম থেকে তাকে বিরত রেখেছি, সুতরাং তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ কবুল করুন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, উভয়ের সুপারিশ কবুল করা হবে। (আহমদ)।